Wednesday , June 20 2018
Home / অন্যান্য / চিকিৎসক নিজেই মর্গে, ইতিহাসের প্রভাষক নিজেই হলেন ইতিহাস

চিকিৎসক নিজেই মর্গে, ইতিহাসের প্রভাষক নিজেই হলেন ইতিহাস

পাঠক হয়তো ভাবছেন কাদের কথা বলছি! না, আমি আবোল তাবোল কিছু বলছি না। আমি বাংলাদেশের তথাকথিত পুলিশ বাহিনীর তেলেসমাতির কথা বলছি। বলছি কথিত বন্দুকযুদ্ধের ইতিহাস। মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করে বাংলার জমিন আজ এমন অগণিত ইতিহাসের সাক্ষী।বলছি ডা. তারিক হাসান সজিব ও কলেজ প্রভাষক জহুরুল ইসলামের কথা। ঝিনাইদহের মাটি যাদের রক্তে লাল হয়েছে।

ঢাকা মহানগরী পশ্চিম ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারিয়েট সদস্য ডা. তারিক হাসান সজিব (৩০) পেশাগত জীবনে একজন চিকিৎসক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। তিনি বেশ কিছুদিন ঝিনাইদহ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে পেশাগত কারণে তিনি ঢাকায় চলে যান। নিজ কর্মস্থল থেকে বাড়িতে এসেছিলেন। ঘরে জমজ সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে রেখে বের হয়েছিলেন। কিন্তু দেখা হয়নি তাদের মুখ। চিকিৎসক হয়েও তাকে লাশ হয়ে চড়তে হয় হাসপাতালের স্ট্রেচারে। রক্তমাখা নিথর দেহ নিয়ে যেতে হয়েছে মর্গে। মুক্তিযোদ্ধা পিতার গর্বিত সন্তান হওয়ার পরেও স্বাধীন দেশের হানাদার পুলিশ বাহিনীর নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ। দিয়েছে কথিত নাশকতার মিথ্যা অপবাদ। পেশাগত জীবনে যিনি শত শত মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন, সেই ডাক্তার সজীব শুধুমাত্র রাজনৈতিক একটি পরিচয়ের কারণে প্রাণ হারালেন ঘাতকের বুলেটে।

১৩ সেপ্টেম্বর ১৬ বিকেলে স্থানীয় হাটের পাশ্ববর্তী রাস্তা থেকে সাদা পোষাকের পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। পুলিশ তাকে গ্রেফতারের কথা অস্বীকার করায় ১৪ সেপ্টেম্বর এ ব্যাপারে তার পরিবারের সদস্যরা ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরীও করেছিল। ২৫ অক্টোবর ১৬ ভোর ৪টার দিকে ঝিনাইদহ শহরের বাইপাস এলাকার শহীদ নজির উদ্দিন সড়কের ভুটিয়ারগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে তার লাশ পাওয়া যায়। সাথে ছিল জামায়াত নেতা জহুরুল ইসলামের লাশও।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঝিনাইদহ পৌর আমীর মো. জহুরুল ইসলাম (৩২) পেশাগত জীবনে একজন ইতিহাসের প্রভাষক ছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তিনি নিজেই একটি ইতিহাস। ৭ সেপ্টেম্বর ১৬ দুপুর দুইটার দিকে ঝিনাইদহ শহরের হামদহস্থ দিশারী প্রি-ক্যাডেট স্কুলে ব্যক্তিগত কাজে গিয়েছিলেন জহুরুল। সেখান থেকে ঝিনাইদহ সদর থানার এসআই আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল সাদা পোশাকধারী পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায়। খুলে নিয়ে যায় স্কুলের সিসি ক্যামেরা। এরপর থেকে জহুরুল ইসলামের কোন খবর পাচ্ছিল না তার পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘ ৪৮ দিন আটক রেখে নির্যাতনের পর ঠাণ্ডা মাথায় গুলী করে হত্যা করে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজায় পুলিশ।

জামায়াতের পৌর আমীর জহুরুল ইসলাম কালিগঞ্জ আসাদুজ্জামান হোসনেয়ারা কেয়া বাগান কলেজের ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক ছিলেন। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করেন। এ ছাড়া ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসা থেকে কামিল পাশও করেছেন। তিনি একাধিকবার ঝিনাইদহ জেলা ও শহর ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন। নিহত হওয়ার মাত্র ৬ মাস আগে তিনি কেয়াবাগান কলেজ এলাকায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন জহুরুল।

জহুরুল ইসলামকে আটক করার ৪৫ দিন পর গোপালগঞ্জে এক অজ্ঞাতনামা লাশ পাওয়া যায়। যার দৈহিক গড়নের সাথে জামায়াতের ঝিনাইদহ পৌর আমীর জহুরুল ইসলামের সাদৃশ্য ছিল। ঠিক ওই সময়ে ঝিনাইদহে বন্দুকযুদ্ধের নামে বেশ কয়েকজন ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়। তাই গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, জহুরুলের লাশ পাওয়া গেছে। তৎক্ষনাৎ গোপালগঞ্জের স্থানীয় পুলিশ লাশটি তড়িঘড়ি করে নিয়ে যায়। পঁচে লাশের চেহারা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রত্যক্ষদর্শীদের তোলা ছবি দেখে বোঝাও যাচ্ছিল না যে, আসলে এটি কার লাশ। এ খবর যখন ঝিনাইদহে পৌঁছায় তখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী শোভা। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে উচ্চতর চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়। এদিকে লাশের হদিস না পেয়ে হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকেন জহুরুলের স্বজনেরা। কিন্তু ওই লাশের ব্যাপারে পুলিশ কোন তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এর তিনদিন পর ২৫ অক্টোবর ১৬ ভোর ৪টার দিকে বন্দুকযুদ্ধের নামে পুলিশ ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে জামায়াত নেতা জহুরুল ইসলাম ও ডা. তারিক হাসান সজিবকে।

ঝিনাইদহ সদর এলাকায় জামায়াত নেতা জহুরুল ইসলাম অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন নেতা ছিলেন। পুরো ঝিনাইদহ শহরে তার যে জনপ্রিয়তা দেখেছিলাম সত্যিই তা কখনই ভোলার নয়। তখন তিনি একজন সদ্য বিদায়ী ছাত্রনেতা। অথচ সর্বমহলে তার পরিচিতি ছিল নজরকাড়া। অমায়িক হাসি আর আন্তরিক বাচনভঙ্গির কারণে সর্বস্তরের মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল চোখে পড়ার মত। অথচ সেই মানুষটিকেও দীর্ঘদিন আটক রেখে রাতের আঁধারে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র রাজনৈতিক হীন স্বার্থ হাসিলের জন্য।

কক্সবাজারের জনৈক জনপ্রতিনিধিকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার পর একটি অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে মিডিয়া। সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন কথিত বুদ্ধিজীবীরা। কিন্তু জামায়াত নেতা জহুরুল ও ডা. সজিবদের হত্যার কোন অডিও রেকর্ড নেই। কিন্তু তাই বলে মানবাধিকার কেন ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্নরকম হবে? জহুরুল ও সজিব হত্যার ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও পুলিশের দেয়া বক্তব্য কোন প্রকার অনুসন্ধান ছাড়াই ঢালাওভাবে প্রচার করেছিল মিডিয়া। ২৬ অক্টোবর ১৬ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংশ্লিষ্টখবরের শিরোনাম ছিল ‘ঝিনাইদহে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই জামায়াত নেতা নিহত’ কিন্তু শিরোনামটা সেদিন ‘ঝিনাইদহে দুই জামায়াত নেতাকে গুলি করে হত্যা’ এবং বিস্তারিত খবরে শুধু অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ এর বরাত দিয়ে তার বক্তব্যই শুধু প্রচার না করে, ঘটনার নেপথ্যের সত্যটা উন্মোচনের চেষ্টা করা যেত। শুধু প্রথম আলোই নয়, দুই একটি পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টাল ছাড়া অধিকাংশই সেদিন সত্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নিহতরা জামায়াত নেতা হওয়ায় সেদিন মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা। সেদিন যদি মিডিয়া আর কথিত বুদ্ধিজীবীরা আজকের মতই প্রতিক্রিয়া দেখাতেন, তবে আজকের এই ঘটনা হয়তো দেশের মানুষকে নাও দেখা লাগতে পারতো।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সূত্র: সংবাদ২৪৭

About superadmin

Check Also

রশিদ খানের সাফল্যের মূল রহস্য বাবা-মায়ের দোয়া!

যতদিন যাচ্ছে, ততই পরিণত ও ক্ষুরধার হয়ে উঠছেন রশিদ খান। প্রতিনিয়ত বিস্ময় উপহার দিয়ে চলেছেন …