Thursday , April 26 2018
Home / রাজনীতি / বেগম খালেদা জিয়া; অনমনীয়, আপোষহীন!

বেগম খালেদা জিয়া; অনমনীয়, আপোষহীন!

স্মৃতি সততই সুখের-এমনকি তার সাথে কিছু দু:খের সঙ্গ-অনুষঙ্গ জড়িত হলেও! ১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অত্যন্ত আকস্মিক ও মর্মান্তিকভাবে সামরিক বাহিনীর কিছু অফিসার ও জওয়ান কর্তৃক তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লে: জেনারেল জিয়াউর রহমান নিহত হন। জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের তরতাজা ও অনুপঙ্খ, মানবিক ও সচিত্র রিাপোর্ট পাঠিয়েছিল আমাদের সহকর্মীদ্বয়। সে সময়ে একটি প্রতিবেদনে এরকম একটি ছবিও ছাড়া হয়েছিলো, যাতে দেখা যাচ্ছে যে মরহুম জিয়ার স্ত্রী অভিনিবেশ সহকারে রোববার পড়ছেন। সত্যি বলতে কি, বেগম খালেদা জিয়ার সেই শুরু। মরহুম জিয়া প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তাঁর নানা কাজ ও পদক্ষেপের কিছু সমালোচনা করেছি। তৎকালীন সরকার সব সময় আমাদের কথা শুনেছেন, আমাদের মতামত গ্রাহ্য করেছেন- এমন কথা বলবো না। তাই বলে এমন কথাও অবশ্যই বলা যাবে না যে, তৎকালীন সরকার সংবাদপত্রের প্রতি খড়গহস্ত ছিলেন। সে সময়ে গণতান্ত্রিক্র মূল্যবোধ যথাযথভাবে পরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হলেও মোটামুটি পরমত সহিষ্ণুতার পরিবেশে বিদ্যমান ছিলো। জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকান্ড আমরা কখনোই সমর্থন করিনি।

প্রকৃতপক্ষে আমরা কোন রাজনৈতিক হত্যাকান্ডই সমর্থন করি না। যে কোন কারণেই হোক, মরহুম জিয়া তাঁর স্ত্রীকে কখনেই রাজনীতির পাদপ্রদীপে আনার চেষ্টা করেননি। এমনকি বিদেশ ভ্রমণেও খালেদা জিয়াকে খুব কমই সফরসঙ্গী করেছেন। কিন্তু জিয়ার মৃত্যুর পর চিত্রটা পাল্টে গেল একবারেই। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় খালেদা জিয়ার শোক-দু:খ ভারক্রান্ত ছবি ছাড়া হতে লাগলো। বলতে দ্বিধা নেই যে, সে সময়েও খালেদা জিয়া ঠিক মোমের পাষাণ মুর্তি ছিলেন না। বরং সদ্য শোকের স্মৃতি-অনুষঙ্গ ধারণ করেও তিনি ছিলেন সুস্থির ও অবিচল, কোন একটি লক্ষ্যের প্রতি আত্মপ্রত্যয়ী ঋজু ও স্থিতপ্রজ্ঞ। সে সময়ে বিএনপিতে অনেক যোগ্য নেতা থাকা সত্ত্বেও বয়োবৃদ্ধ বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে এর অবস্থা ছিল যথার্থই নড়বড়ে, ভগ্নদশাপ্রাপ্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত, সর্বোপরি সুবিধাবাদী ও ষড়যন্তকারীদের ভিড়ে ভারাক্রান্ত। খালেদা জিয়া নিশ্চিতভাবেই এসব বুঝতে পেরিছেলেন। আমরা প্রমাদ গুণলাম। লিখতে বাধ্য হলাম যে, রাজনীতিতে অচিরেই বেগম খালেদা জিয়ার আবির্ভাব হচ্ছে। নানা কারণের মধ্যে দুটো কারণ অন্যতম ছিল।

প্রথমটি হলো: উপমহাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অর্জনের সম্ভাবনা বেশ ভালো। অন্তত দলকে অনিবার্য ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্যে এর কোন বিকল্প নেই। এবং জনসাধারণের মধ্যেও প্রয়োজন পূর্বতন প্রধানের ইমেজ যথাযথভাবে ব্যবহার করা চলে। আর দ্বিতীয়ত: বিচারপতি সাত্তারের যথেষ্ট যোগ্যতা ও ক্ষমতা ছিল না বিএনপির মত বড় একটি রাজনৈতিক দলকে সুসংহত উপায়ে চালিত করার। ঠিক একম অবস্থায় বিএনপি’র অপেক্ষাকৃত তরুন নেতৃত্ব এবং মরহুম জিয়ার ভক্ত অনুসারীরা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকেই কায়মনোবাক্যে কামনা করেছিলো। আজ এতেদিনে স্বীকার করতে দ্বিধা থাকা উচিৎ নয় যে, সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে তিনি আদৌ ভুল করেননি। ১৯৭১ সালের স্বাধীন মুজিবনগর সরকারের কথা বাদ দিলে খালেদা জিয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তৃতীয় ক্ষমতাবান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের সংবিধানে ঐতিহাসিক একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী এনে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর সেই ক্ষমতাকেই সুসংহত করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রেখেছন। বাংলাদেশেরে রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়ার এই উত্থান, এই বর্ণাঢ্য আবির্ভাব এক কথায় ঐতিহাসিক, অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী ছিল।

সোমবার ১ জুলাই ’৯১-এর সন্ধ্যায় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সার্বভৌম জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল আনার আগে খালেদা জিয়া দেশ ও জাতির উদ্দেশে বেতার ও টেলিভিশনে এক ভাষণ দেন। এ সময় তাঁর পরনে ছিল সাদা সিল্কের শাড়ি ও গোলাপী রঙয়ের ওড়না। খালেদা জিয়ার এই ভাষণ ছিল মার্জিত ও সংক্ষিপ্ত। সুলিখিত ও বিনীত, গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় উদ্দীপিত। প্রকৃত প্রস্তাবে ও সুভাষণে তিনি তিনজোটের রূপরেখায় প্রস্তাবিত জনসাধরণের বহুপ্রত্যাশিত সংসদীয় গণতন্ত্রের কথাই বেলছেন। এ সম্পর্কে জনমনে এবং অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বে কাছে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার প্রকৃত মনোভাব সম্পর্কে যে অস্পষ্টতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল সেই সংশয়ই অকপটে দূর করেছেন। ভাষণের এক পর্যায়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, যে কায়েমী স্বার্থবাদী মহল যাদের কাছে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা পছন্দ হয়নি- তারাই প্রেসিডেন্ট জিয়াকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করে। এবং সেই ষড়যন্ত্রের ধারাতেই স্বৈরাচারের প্রতিভূ হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে অপসারণ করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। এখানেই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা আবার বিঘ্নিত হয়। দেশ নিপিতিত হয় স্বৈরাচারী শাসনের কবলে। দুর্নীতিপরায়ণ, নেতিকতা বিবর্জিত অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা দেশে কায়েম করে এক দুঃসহ শাসন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ও ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে এই স্বৈরাচারী দু:শাসনের বিরুদ্ধে নিরন্তর আপোষহীন সংগ্রাম এবং মাথা নত না করার অনমীয় মনোভানের ইতিহাস। বলা বাহুল্য, স্বৈরাচারের এই দু:শাসনের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, জামায়তে ইসলামী, পাঁচদলীয় বা মোর্চার নেতৃবৃন্দের অবশ্যই সংগ্রাম করেছেন। আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানে তাঁদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার ও অনস্বীকার্য। পাশাপাশি একথাও জ্বলজ্বলে ও হিরুন্ময় সত্য যে, তাঁরা কেউই এই আন্দোলনের ব্যাপারে খালেদা জিয়ার মতো অনমনীয় ও আপোষহীন ছিলেন না। খালেদা জিয়ার চারিত্রক ঋজুতা এরশাদীয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাঁর অনমনীয় ও নিরাপোষ সংগ্রামী মনোভাবই মূলত বিএনপি পৌঁছে দেয় একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অপ্রত্যাশিত সাফল্যের স্বর্ণশিখরে। আবারও বলি, খালেদা জিয়ার অবিচল ও স্থিতপ্রজ্ঞ লক্ষ্যই ছিলো এই উজ্জ্বল স্বর্ণশিখর।

যে কোন সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিরুপণের পক্ষে একশ’ কিংবা দেড়শ’ দিন মোটেও যথেষ্ট সময় নয়। তবু যদি এ সম্পর্কে অপটে ও সরাসরি কিছু বলতেই হয়, তাহলে বলা যায় যে, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের ব্যর্থতার চেয়ে সাফল্যের পরিমাণই বেশি। বিএনপি আনীত সংবিধান সংশোধনী বিল এদিক দিয়ে প্রথম ও প্রধান একটি সাফল্যের মাইলফলক। উল্লেখ্য, সরকার পদ্ধতির প্রশ্নে বিএনপি প্রায় কখনোই সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেনি। বরং এ সম্পর্কে তার বলেছে, জাতীয় সংসদই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। বিএনপি’র গঠনতন্ত্র, জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচি এবং বিএনপি’র অনেক সদস্যের প্রধান ও অন্যতম ঝোঁক ছিল প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির প্রতি। এ নিয়ে আমরা আগে লিখেছিও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপে, গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় এবং তিনজোটের রূপরেখার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করে বিএনপিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ব্যক্ত করে সংবিধানে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী বিল আনতে হয়েছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে এটা বিএনপি’র এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাফল্য।

বিএনপি’র সরকারের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো: জলোচ্ছা¦স ও টর্নেডো পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি মোকাবেলা। বিএনপি দুর্যোগে ও ত্রাণ মোকাবেলায় যোগ্যতা ও সাহসের পরিচয় রেখেছে অবশ্য এতে আন্তর্জাতিক বিশ্ব সম্প্রদায়ের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সাহায্যও করছে অভূতপূর্ভভাবে- যা প্রকারান্তরে নির্বাচিত একটি জনগণের সরকারের প্রতি তাঁদের আস্থাই ব্যক্ত করে। তা সত্ত্বেও অতীতের মতো রিলিফ বণ্টনে অনিয়ম- কারচুপি ও দুর্নীতির অভিযোগ এবারে ওঠেনি বললেই চলে।

বিএনপি’র সরকারের তৃতীয় উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলে: জাতীয় বাজেট। স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে প্রায় বিধ্বস্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্বল্প সময়ে একটি প্রকৃত গণমুখী ও উন্নয়নমূলক বাজেট প্রণয়ন মোটেও সহজসাধ্য ছিলো না। অপ্রিয় সত্যের খাতিরে বলতেই হয় যে, এবারের বাজেটও মোটামুটি গতানুগতিক ও পরনির্ভরশীল। প্যরিস বৈঠক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সাহায্য ও অনুদানের আশ্বাসও পাওয়া গেছে আশাপ্রদহারে। বাজার অর্থনীতি, বেসরকারী খাত, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও বেতন বৃদ্ধি না করে সরকার বাজেটে কিছু কিছু নতুন পদক্ষেপ গ্রহনের চিন্তা-ভাবনাও করেছেন বটে।

খালেদা জিয়ার সরকারের চতুর্থ সাফল্য হলো: স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিচার। বলা বাহুল্য, এই বিচার সহজসাধ্য ছিল না বরং এরশাদের বিচার সমাধান করা ছিলো বিরাট চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সরকার বলতেই হয় যে, সাহসিকতার সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন। এরশাদের বিরুদ্ধে অর্থসংক্রান্ত দুর্নীতিসহ অন্যান্য মামলাও চলছে। তবে এরশাদের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ মন্ত্রী ও আমলার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। অন্তত জনসাধারণের প্রত্যাশা তাই।

নেতৃত্বের কিছু গুণাবলী সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন। প্রকৃত নেতা তার অনুসারীদের কাছে কিছু দাবি করেন এবং সাফল্যের সাথে তা আদায় করে নেন। জনসাধারণ যেখানে যেতে মনস্থির করেছে, যে কেউই সদিচ্ছা থাকলে তাদের সেখানে নিয়ে যেতে পারেন। পক্ষান্তরে প্রকৃত নেতা জনসাধারণকে পথ দেখিয়ে সেই ঈপ্সিত লক্ষ্যে নিয়ে যান, যেখানে জনগণের উন্নততর অংশ যেতে চান, অথচ যাওয়ার পথ জানে না, চেনে না। এ লক্ষ্য হলো কল্যাণ ও সমৃদ্ধি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। প্রকৃত নেতা শুধু ক্ষমতাশালী হবেন না। বরং সে ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে জনমানুষের শান্তিকল্যাণ ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যেও বাস্তবানুগ কিছু অবশ্যই করবেন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার কাছে জনসাধরণের প্রত্যাশা অনেক। এবং এ প্রত্যাশা পরিপূরণে তিনি ইতিমধ্যেই সফলতা লাভ করছেন।

About editor

Check Also

যেভাবে ধরা খেলো তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জনের বানোয়াট তথ্য ..

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আইনজীবী বলেছেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবেই ব্রিটেনে বসবাস করছেন। …