Wednesday , October 17 2018
Home / মুক্তমত / ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি করতে করতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর !

‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি করতে করতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর !

আখতার হামিদ খান : ১৮৮৫ খ্রী: প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে হিন্দু সমাজের সার্বিক অভ্যুত্থান না ঘটলেও বুদ্ধিজীবী ও যুবসমাজের ভেতর তা যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই প্রতিক্রিয়া যে প্রধানত ইংরেজ শাসনকে বিপন্ন করবে তা ইংরেজদের পক্ষে বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়। ফলে বঙ্গদেশের হিন্দু-মুসলমানের ভেতর বিরোধ বাঁধিয়ে দিয়ে নির্বিঘেœ শাসন করার দুরভিসন্ধি নিয়ে ইংরেজ তথাকথিত প্রশাসনিক সুবিধার নামে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব করে। এই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ‘ইহার বিরুদ্ধে যে তীব্র আন্দোলনের সূত্রপাত হয় তাহাই কালক্রমে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে পর্যবসিত হয়।

বঙ্গভঙ্গের কারণ সম্পর্কে সরকারি ভাষ্যের সঙ্গে বেসরকারি ভাষ্যের কোন মিল নেই। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, সমগ্র বঙ্গ প্রদেশ ছোট নাগপুর ও উড়িষ্যাসহ) একজন শাসকের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। এ কারণে তার বিভক্তির প্রস্তাব আসে। ইংরেজ যে কারণটিকে মূল প্রস্তাবের অঙ্গীভূত করে চূড়ান্ত আঘাত হেনেছে তা হলো বঙ্গভঙ্গের ফলে একটা আলাদা মুসলিম প্রদেশ সৃষ্টি হবে, যা তুলনামূলকভাবে পশ্চাদপদ মুসলমান সমাজকে আর্থিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে এগিয়ে আসতে সহায়তা করবে। এই কারণটিই শেষ পর্যন্ত গোটা আন্দোলনকে একটা আত্মঘাতী পথে টেনে নিয়ে যায়- যা ইংরেজের অভিপ্রায়ের পরিপূরক।

তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে লর্ড কার্জন এই কাজটি করেছিলেন এবং বাউনানী-মধ্যবিত্ত হিন্দু শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান আন্দোলন প্রবণতার মূলে বাধা সৃষ্টি করা। কারণ এদ্বারা একটা আলাদা মুসলিম প্রধান প্রদেশ (পূর্ববঙ্গ ও আসাম) সৃষ্টি হবে এবং হিন্দু অধ্যুষিত প্রদেশে (পশ্চিমবঙ্গ, ছোট নাগপুর ও উড়িষ্যা) বাঙ্গালী হিন্দু সমাজ সংখ্যালঘুতে পরিণত হবেন-যারা এখন বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটা বিরাট হুমকিস্বরূপ।
দুই. হিন্দু-মুসলমানের ভেতর স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। এতে অন্য অর্থে ইংরেজ শাসনতান্ত্রিক সুবিধা পেতে পারে। তিন. আসামের চা প্রধান অঞ্চল এবং পূর্ববঙ্গের পাট প্রধান অঞ্চলকে একই শাসন কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা।

বঙ্গভঙ্গ লর্ড কার্জনের দীর্ঘ চিন্তার ফল। একথা তার ভারত ত্যাগের পর স্পষ্ট হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন পর্যায়ে বঙ্গভঙ্গের যেসব প্রস্তাব এসেছে তাতেও একথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ১৮৯৬ খ্রী. চট্টগ্রামের কমিশনার ডব্ল্যু বি ওল্ডহ্যাম এবং তার কিছুকাল পরে স্যার এন্ড্রু ক্লোজার ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দুদের প্রাধান্যের আশংকায় বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯০৩ খ্রী. ৩ ডিসেম্বর ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব এইচ.এইচ. বিজলে প্রথম এই ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন।

প্রাথমিকভাবে তিনটি পর্যায়ে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব আসে। প্রথমত: চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ত্রিপুরাকে বঙ্গদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসাম প্রদেশের সাথে যুক্ত করা। চট্টগ্রামের অধিবাসীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে।

দ্বিতীয়ত: চট্টগ্রাম বিভাগের সঙ্গে ঢাকা ও ময়মনসিংহকে বঙ্গদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের অন্তর্ভুক্ত করা। উভয় সম্প্রদায়ের লোকই এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এবার লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে জনমত সংগ্রহের জন্যে পূর্ববঙ্গ সফরে গেলেন এবং সফরের নাম করে জনসাধারণকে উস্কানিমূলক ও ভীতিপ্রদ প্রচারণার মাধ্যমে বশীভূত করতে চ্ইালেন। এই সফরের ফল হলো তার তৃতীয় প্রস্তাব। এবারের প্রস্তাবে পরিকল্পিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের সঙ্গে সমগ্র উত্তরবঙ্গ এবং ফরিদপুর ও বরিশাল জেলা অন্তর্ভুক্ত হলো। চূড়ান্ত প্রস্তাবটি অত্যন্ত গোপনে তৈরি হলো যা গ্রহণ করতে ভারত সচিবও ইতস্তÍত করছিলেন। প্রথমদিকে ইংরেজরা এবং অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পত্রিকাগুলোও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করছিলেন।

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ বিধিবদ্ধ হয়। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সমগ্র বঙ্গ প্রদেশব্যাপী প্রচ- আন্দোলনের সূচনা হয়। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অগ্রসর হিন্দুসমাজ কোনমতেই এই প্রস্তাব মেনে নিলেন না। কারণ বঙ্গদেশে যখন শাসন পরিষদ গঠনের কথা বলা হচ্ছে তখন তারা পশ্চিমবঙ্গে বিহারী ও উড়িষ্যাদের দ্বারা এবং পূর্ববঙ্গে মুসলমান ও আসামীদের দ্বারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। ছোটবড় জনসভা ও বিক্ষোভের মাধ্যমে তারা নিজেদের মনোভাব ব্যক্ত করলেন। ১৬ অক্টোবর প্রতিরোধ দিবস হিসেবে প্রতিফলিত হলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উভয় বঙ্গের মিলনের চিহ্নস্বরূপ রাখিবন্ধন এর প্রস্তাব প্রদান করলেন এবং রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রকাশের জন্যে ‘অরণ্ঠন পালন’ করার প্রস্তাব করলেন। শোক চিহ্নস্বরূপ সেদিন সবাই উপবাসব্রত পালন করবেন। দোকানপাট খোলা হবে না, গাড়ি-ঘোড়া কিছুই চলবে না। ১৬ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথকে শোভাযাত্রার পুরোভাগে রেখে বাংলার আপামর জনসাধারণ ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি করতে করতে গংগা¯œানে শুদ্ধ হয়ে আন্দোলনের সূচনা করলেন। এই আন্দোলনের সময় স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় বঙ্গদেশের তথা ভারতবর্ষের অবিসংবাদিত নেতারূপে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন।

বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে যে অভূতপূর্ব গণজাগরণের সূচনা হয় তাতেই এদেশে বিলেতি পণ্য বর্জন তথা স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। কিন্তু এই আন্দোলন ধীরে ধীরে ধর্মীয় রূপ লাভ করে। রমেশচন্দ্র মজুমদার এই আন্দোলনের তীব্রতার কারণ হিসেবে বিদেশী দ্রব্য বর্জনকে হিন্দুধর্মের অঙ্গীভূত করা এবং মন্দিরে দেবমূর্তির সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করার কথা উল্লেখ করেছেন। এই আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য অবদান হলো কংগ্রেসের অভ্যন্তরে চরম ও নরমপন্থীদের ভেতর দ্বন্দ্ব। ১৯০৫ খ্রী. কংগ্রেসের বারাণসী অধিবেশন থেকে এর সূচনা এবং ১৯০৭ খ্রী. সুরাট অধিবেশনে এই চূড়ান্ত রূপ লাভ। ফলত স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বঙ্গদেশব্যাপী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনেরও সূচনা হয়। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন চরমপন্থী মতাদর্শের ফল হলেও তাঁদের একটা বিরাট অংশ প্রত্যক্ষভাবে এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

স্বদেশী আন্দোলন বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে ব্যাপকতা লাভ করলেও তার সূচনা হয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন জোরদার হয়েছে এবং সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। এই্ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনজীবনের বিভিন্ন স্তরে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করা এবং বিদেশী দ্রব্য বর্জনের ভেতর দিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করা। ‘সঞ্জীবনী’ ও অমৃত বাজার পত্রিকা প্রথম বিদেশী দ্রব্য বর্জনের প্রস্তাব করে এবং ‘হিতবন্ধু’ অর্থনৈতিক চাপে কাজ হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করে। এই আন্দোলন ধীরে ধীরে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের ফলে শুধু বিদেশী পণ্যই বর্জিত হলো না। বিদেশী শিক্ষার স্থলে জাতীয় শিক্ষা প্রবর্তনের প্রস্তাব উঠলো চারদিকে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলো। রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক জাতীয় শিক্ষার জন্যে এক লাখ টাকা দান করলে কৃতজ্ঞ দেশব্যাপী তাঁকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বিধানচন্দ্র পাল সিলেটে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করেন এবং অরবিন্দ ঘোষ বহু টাকার চাকরি পরিত্যাগ করে নামমাত্র বেতনে জাতীয় কলেজের অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। এভাবে গোটা আন্দোলনটি ধীরে ধীরে সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে পর্যবসিত হয়।

বঙ্গভঙ্গ প্রসঙ্গে মুসলমানদের ভেতর তিন ধরনের মনোভাব কাজ করেছে। প্রথম: মুসলমানদের ভেতর অনেকে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। যেসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা হলেন আবদুর রসুল, আবদুল হালিম গজনভী, মাওলানা খররোখ আহমদ নেজামপুরী, আবুল কাসেম, লিয়াকত হোসেন প্রমুখ। মোহামেডান ফ্রেন্ডস এসোসিয়েশন বঙ্গভঙ্গের ফলে কলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চা এবং মোহসেন ফান্ড থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। মোহামেডান এসোসিয়েশনের সভাপতি খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইউসুফ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন।

কিন্তু মুসলমানদের চাপে তাঁকে ঘোষণা করতে হয়েছিল যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই সভায় যোগদান করেছেন। সমিতির সভাপতি হিসেবে নয়। সেন্ট্রাল মোহামেডান এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি আমির হোসেন বহুভাষী অঞ্চলকে অপ্রয়োজনে বিভক্ত করার মনোভাব প্রকাশ করেন এবং বর্তমান ব্যবস্থার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই বলেও তিনি মতামত ব্যক্ত করেন। যে নবাব পরিবার বঙ্গভঙ্গের অন্যতম সমর্থক ছিলেন, তারই একজন সদস্য, খাজা আতিকুল্লাহ কংগ্রেস অধিবেশনে বঙ্গবঙ্গের বিরুদ্ধে মতামত প্রদান করেন।

ড. সুফিয়া আহমদ, খাজা নাজিমুদ্দিন ও খাজা শাহাবুদ্দিনের বরাত দিয়ে বলেছেন, যে খাজা আতিকুল্লাহ নাকি খাজা সলিমুল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন। পরে বঙ্গভঙ্গ রদ করার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত সভায়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন।

About banglamail

Check Also

প্রকৃত ধর্মব্যবসায়ী আওমিলীগের স্বরুপ উন্মোচন !

আজকে আমি বাকশালী সরকারের কয়েকটি ভন্ড দিক তুলে ধরবো। দেখুন- আওয়ামীলীগ নামে যে রাজনৈতিক দল …