হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় আনার নিল নকশা নিয়ে অাবারও ঢাকায় ভারতের প্রণব মুখার্জী

প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের জন্য একটি বিষাক্ত নাম। ‘বাংলাদেশের জামাইবাবু’ ভাব ধরে এই ব্যক্তির বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে বিগত দুই দশক ধরে। বাঙালী পরিচয়ের সুবাদে আর ভারতের রাজনীতির উচ্চমহলে অবস্থান করার কারণে প্রণবকেই সব সময় বাংলাদেশের রাজনীতি-কূটনীতি দেখার দায়িত্ব দিত ভারতের সবগুলো সরকার। প্রণব শেখ হাসিনার পারিবারিক বন্ধু। ফলে এটা পরিস্কার ভারতপন্থী আওয়ামী লীগকেই সব সময় ক্ষমতায় রাখা বা আনার জন্য কুশেশ করে গেছেন আজীবন।

সম্প্রতি প্রণবের প্রকাশিত বইয়ে তিনি নিজে এসব কথা স্বীকার করেছেন। ২০০৯ ও ২০১৪ তে হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছিলেন তার প্রমাণ নিচে তার বই থেকে উল্লেখ করা উদ্ধৃতিটি–

প্রণব লিখেছেন, “সেই সময়ে ভারতের ভূমিকা লিখতে গিয়ে প্রণববাবু লিখেছেন- ভারত সরকার ক্রমাগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলত। ভারত সরকারের আর্জি ছিল, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ড. ফখরুদ্দীন আহমদ চতুর্দশ সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত আসেন। আমিও ২০০৭ সালে সাইক্লোনে বিধ্বস্ত বাংলাদেশে সাহায্য দেওয়ার জন্য যাই। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান মইন উ আহমেদ ছয়দিনের সফরে ভারতে আসেন। তিনি আমার সঙ্গে দেখাও করেন। তখন ঘরোয়া কথাবার্তায় আমি রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির কথা বলি। কিন্তু সেনাপ্রধানের আশঙ্কা ছিল, শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিলে তাকে বরখাস্ত হতে হবে। তখন আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশ্রুতি দিই, যদি শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন, তাহলেও তাকে বরখাস্ত করা হবে না। পরে আমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে হাসিনার সঙ্গে কথা বলে তাকে বহাল রাখার ব্যবস্থা করি। ”

এরপর প্রণব লিখেছেন, আমি নিজে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সঙ্গে সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করি এবং শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তাকে হস্তক্ষেপ করতে বলি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এম কে নারায়ণের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির উদ্যোগ নিই। পরে সেই সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। আমেরিকায় তার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করি।”

তিনি এও লেখেন, ‘শেখ হাসিনা যখন কারাবন্দি তখন বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা তাকে ছেড়ে চলে যান। তাদের অনেকেই পরে যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, আমি তাদের বলি, যখন কেউ বিপদে পড়ে তখন তাকে পরিত্যাগ করা অত্যন্ত অনৈতিক কাজ। আমি তাদের ভর্ৎসনা করি। এটা ঠিক, শেখ হাসিনা আমাদের পরিবারের অত্যন্ত নিকট বন্ধু। আমি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হই তখন বাংলাদেশের সাহায্য করার জন্য অনেক উদ্যোগ নিই এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করানোর জন্য কূটনৈতিক চাপ তৈরি করি। ২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো এবং শেখ হাসিনা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হলেন। এরপর শেখ হাসিনা ২০১০ সালে ভারতে আসেন এবং তার সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক মাইলফলক বলে স্বীকৃত হয়ে রয়েছে।”

রোববার আবারও ঢাকায় এসেছেন প্রণব। ৫ দিনের দীর্ঘ সফর। সামনে নির্বাচন। এবারও নিশ্চয়ই হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার ফন্দি ফিকির করতেই ঢাকায় আগমন তার। আওয়ামী লীগের দালাল বলে চিহ্নিত সৈয়দ বোরহান কবীরের অনলাইন পত্রিকা বাংলা ইনসাইডার লিখেছে, “সোমবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বর্ষীয়ান এই অভিভাবক তূল্য রাজনীতিবিদ। প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরে অন্য সবকিছু ছাপিয়ে এই বৈঠকের দিকে দৃষ্টি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের। নির্বাচনের এক বছরের কম সময় আগে প্রণব মুখার্জি-শেখ হাসিনার বৈঠক আপাত: নিরীহ হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকেই প্রণব মুখার্জির কিছু না কিছু ভূমিকা রয়েছে। রাজনীতি থেকে অবসর নিলেও, এখনো ভারতের রাজনীতিতে প্রণব মুখর্জির প্রভাব অনেক। রাজনৈতিক মত-পার্থক্যের বাইরে কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে তিনি শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তাঁর রাষ্ট্রপতি থেকে বিদায়ের সময় এক আবেগঘন বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রণব মুখার্জি যতটা জানেন বা বোঝেন তা সম্ভবত ভারতের রাজনীতিতে অন্য কেউ বোঝে না। তাই সরকারের যেই থাকুক, বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রণব মুখার্জির মতামত বা সুপারিশ সবসময় ভারতের নীতি নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

আরও লেখা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রণব মুখার্জির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শ্রদ্ধা আর ভালবাসার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রণব মুখার্জিকে তাঁর একজন অভিভাবক মনে করেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ওয়ানইলেভেন সরকার এলে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শেখ হাসিনাকে মুক্ত করা এবং বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০১৪ এর নির্বাচনের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ভূমিকা নীতি নির্ধারকের ছিল। বিএনপিসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচন বর্জন করে। ১৫৪ টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। ভারতে কংগ্রেস সরকার ওই নির্বাচন সমর্থন করে। নির্বাচনের পর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে ভারত সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারে বলেও অনেকে ধারণা করেছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসের অনেক বিদেশ নীতি পাল্টে দিলেও বাংলাদেশের ব্যাপারে কংগ্রেসের নীতিই অনুসরণ করে। এর পেছনেও প্রণব মুখার্জির অবদান আছে বলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনেও ভারত একটি বড় ফ্যাক্টর। নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ২০১৪ এর টানাপোড়েন ও অচলঅবস্থা এখনো বিদ্যমান। আওয়ামী লীগ যেমন সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে চায়। তেমনি বিএনপিও সহায়ক সরকারের দাবিতে অটল। এরকম একটি রাজনৈতিক সংকটে, ভারতের ভূমিকা কী হবে তা স্পষ্ট নয়। প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর কী বাংলাদেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ভারত সরকারকে প্রভাবিত করবে? কিংবা প্রধানমন্ত্রীর অভিভাবক হিসেবে প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে সাউথ ব্লককে কি কোনো পরামর্শ দেবেন।”

এসব প্রচারণা আওয়ামী লীগ করাচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশে তার প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করতে চায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভারতবিরোধী মনোভাব আছে সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে বিষয়টিকে সহজ করে তুলতে চায় আওয়ামী লীগ ও ভারত। মূল কথা হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে আবারও ক্ষমতায় বসানোর ফন্দি আটতেই ঢাকায় এসেছেন প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের শত্রু, গণতন্ত্রে শত্রু প্রণব মূখার্জি।

Comments Us On Facebook: