Thursday , October 18 2018
Home / আলোচিত সংবাদ / জেরুজালেম ইস্যুতে মোদির সমর্থন পাবেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু?

জেরুজালেম ইস্যুতে মোদির সমর্থন পাবেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নয়া দিল্লির বিমানবন্দরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানাতে নিজের প্রটোকল ভেঙে ফেলার অভ্যাস বজায় রেখেছেন। স্বভাবতই আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন নেতানিয়াহুকে। যাকে তিনি ‘বিবি’ বলেই সম্বোধন করেন। একে অন্যকে বন্ধু বলে আখ্যায়িত করেন। যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ‘বিবি-মোদি রসায়ন’ বলে অনেকেই আখ্যায়িত করেন। নেতানিয়াহুর সঙ্গে মোদির আলিঙ্গননরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক ইসরায়েল সফরের পাল্টা সফর হিসেবে ছয় দিনের জন্য রবিবার ভারত এসেছেন নেতানিয়াহু। সঙ্গে স্ত্রীসহ ১৩০ সদস্যের বড় একটি প্রতিনিধি দল রয়েছে। ভারত-ইসরায়েল ২৫ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে কোনও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এটি দ্বিতীয় ভারত সফর। এর আগে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন ২০০৩ সালে ভারত সফর করেন। এর আগে ১৯৯২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। এরপর থেকেই উভয় দেশের সম্পর্ক বেড়েছে।

এমন এক সময়ে নেতানিয়াহু ভারত সফর করছেন, যখন জেরুজালেম ইস্যুতে ইসরায়েলের বিপক্ষে জাতিসংঘে ভোট দিয়েছে ভারত। জেরুজালেম ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই সফরে দেশ দু’টির সম্পর্কের সৃষ্টি হওয়া দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে। যদিও ভারত ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনিদের পক্ষেই অবস্থান নিয়ে আসছে। ফিলিস্তিন ইস্যু ছাড়াও এই সফরে কৃষি, পানি, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে উভয় দেশের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সফরে মোদি ও বিবি নয়টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেন। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক, শিল্প সহযোগিতা চুক্তি, সাইবার সহযোগিতা চুক্তি, দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য চুক্তি, ফ্লাইট হালনাগাদ করতে চুক্তি, যৌথ চলচ্চিত্র প্রযোজনা চুক্তি ও মহাকাশ বিষয়ক একটি চুক্তিও রয়েছে।ইসরায়েলি বার্তা সংস্থা ওয়াইনেট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও নেতানিয়াহুর এই সফর ভারতের চেয়ে ইসরায়েলের জন্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছয় মাস আগে ইসরায়েল সরকার প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের একটি পরিকল্পনা নেয়। যার লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন খাতে সম্পর্ক বাড়ানো।

নেতানিয়াহুর ভারত সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি অন্যতম আলোচনার বিষয়। আর এটাকে গুরুত্ব দিয়েই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ১৩০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পৌঁছেছে দিল্লি। এই দলের মূল লক্ষ্য উভয় দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বাড়ানো। ইসরায়েল সফরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে হেঁটে বেড়ান মোদিজওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিভাগের গবেষক মার্তন্দ ঝা লিখেছেন, গত ২৫ বছরে উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০০ মিলিয়ন থেকে ২০১৬-১৭ সালে চার শ কোটিতে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যানে প্রতিরক্ষা বা অস্ত্র কেনার বিষয়টি যুক্ত করা হয়নি। ভারতের বড় বাজার ও ভোক্তাদের সংখ্যার হিসেবে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম। ফলে ইসরায়েল ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে চায় আরও বেশি।মার্তন্দের মতে, ভারত-ইসরায়েলের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও পর্যটন খাত গুরুত্ব পাবে। তিনি জানান, বর্তমানে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা হচ্ছে ভারত। ভারতের কাছে ইসরায়েলের অস্ত্র বিক্রি ৬০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।এই গবেষক জানান, প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অনেক দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে ভারতে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হিসেবে রাশিয়াকে ছাপিয়ে যেতে পারে দেশটি। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত। এই চুক্তির অর্থমূল্য প্রায় ২০০ কোটি ডলার।

গত কয়েক বছর ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অনেক উন্নতি হলেও এতে জড়িয়ে আছে জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজ উভয় দেশের সম্পর্ক নিয়ে উল্লেখ করেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক চায়, কিন্তু ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়াতে চায় না। এর কারণ হচ্ছে, উভয় দেশ উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তাদের অগ্রাধিকার তালিকা ভিন্ন। পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বিগ্ন ইসরায়েল। দেশটি তা খর্ব করতে চায়। বিশেষ করে সিরিয়া ও লেবাননে ইরানি প্রভাব ঠেকাতে মরিয়া ইসরায়েল। অন্যদিকে, ইরানকে কৌশলগত কারণে মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে ভারত। ইরানের ছাবাহার বন্দরকে কাজে লাগিয়ে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে চায় দিল্লি।

চীন ইস্যুতেও উভয় দেশের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড (ওবোর)-এ অংশগ্রহণ করতে উদগ্রীব ইসরায়েল। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে দিল্লির উদ্বেগকে আমলে নিতে রাজি নয় তেলআবিব।সর্বোপরি, ফিলিস্তিনি ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। সম্প্রতি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যানে জাতিসংঘের ভোটে ফিলিস্তিনের পক্ষ নিয়েছে ভারত। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক তালমিজ আহমেদ লিখেছেন, ফিলিস্তিনের পক্ষে ভারতের অবস্থান শুধু নৈতিক কারণে নয়। এর পেছনেও রয়েছে ভারতের রাজনীতি। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কে ফিলিস্তিন ইস্যুতে তিনটি বিষয় গুরুত্ব দেয় ভারত। জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, শরণার্থীদের ফেরত দেওয়া ও দখলকৃত ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেওয়া। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরোধিতার কারণ হলো, ভারত দাবি করে জম্মু-কাশ্মির পাকিস্তান অবৈধভাবে দখল করেছে। ফলে ভারত যদি ফিলিস্তিনে দখলদারিত্বের বিরোধিতা না করে তাহলে জম্মু-কাশ্মির নিয়ে তারা দাবি করতে পারবে না একে অপরকে বন্ধু বলে সম্বোধন করেন মোদি ও নেতানিয়াহুঅবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো মনোজ জোশি লিখেছেন, ইসরায়েল পারমাণবিক শক্তি হতে পারে কিন্তু তাদের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত। যদিও ভারতের একটা বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মিত্রতা অনুভব করে। কিন্তু এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের জটিল এজেন্ডা রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বিবেচনা করে আসছে। এছাড়া দেশটি ইসরায়েল, ইরান ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক সমন্বয় করে চলে। কিন্তু ভারতকে এক্ষেত্রে সতর্কভাবে এগুতে হয়। আর এ জন্যই হয়ত, নেতানিয়াহুর সফরের পরই মোদি আগামী মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিস্তিন ও জর্ডান সফর করবেন।

ভারতের রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অশরিত বিরভাদকার লিখেছেন, ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র ও সৌদি-মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষশক্তির সম্পর্ক স্পষ্ট হওয়ার কারণে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুটি মাত্র একটি অংশ মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইসরায়েলের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক গড়ে তুলবে, এটা ভাবা কঠিন।

About editor

Check Also

দুর্ঘটনার ওপর কারও হাত নেই – জাফর ইকবাল

আমি দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। মাঝে মাঝেই আমি খবরের কাগজের কোনো কোনো খবর পড়ার সাহস পাই …