চৈত্র সংক্রান্তি বাংলা বছরের শেষ দিন

বাংলা বছরের শেষ দিনটিকে বলা হয় চৈত্র সংক্রান্তি। সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) এবং পার্বত্য চট্রগ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী (উপজাতি) চৈত্র মাসের শেষ দিন পুরাতন বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন ধরনের আনন্দ-উৎসব করে থাকে, একে চৈত্র সংক্রান্তি বলে।

বাঙালিরা এই দিনটিতে বেশ কিছু লোকাচারমূলক অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। যেমন— গাজন , নীল পূজা বা চড়ক পূজা, চৈত্রসংক্রান্তির মেলা, শেষ প্রস্তুতি চলে হালখাতার।

CHAITRA SANGKRANTI-2

সনাতন  (হিন্দু) পঞ্জিকা মতে, দিনটিকে গণ্য করা হয় মহাবিষুব সংক্রান্তি। হিন্দুরা এ দিনটিকে একটি পুন্যদিন বলে মনে করে। তারা নদীতে বা দিঘীতে পুন্যস্নান করে থাকে। এছাড়া  হিন্দু ধর্ম মতে, বাংলা মাসের শেষ দিনে শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মকে পুণ্যের কাজ বলে মনে করা হয়।

বাঙালী হিন্দু কৃষকরা চৈত্রের শুরু থেকে বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত (সূর্যের যখন প্রচন্ড উত্তাপ থাকে)  সূর্যের তেজ প্রশমণ ও বৃষ্টি লাভের আশায় বহু অতীতে চৈত্র সংক্রান্তির উদ্ভাবন করেছিলেন বলে জানা যায়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে উদ্বিগ্ন কৃষককুল নিজেদের বাঁচার তাগিদে বর্ষার আগমন দ্রুত হোক, এই কামনায় পুরো চৈত্র মাসজুড়ে উৎসবের মধ্যে সূর্যের কৃপা প্রার্থনা করে। চৈত্রে সূর্য প্রকৃতিতে প্রচন্ড তাপ দেয়। তাই সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বীরা চৈত্র সংক্রান্তিতে নানা নৈবেদ্য দিয়ে তাকে (সূর্যকে) তুষ্ট করে। হিন্দুরা ৩৪ কোটি দেবতা বিশ্বাস করে।তন্মধ্যে একটি দেবতা “সূর্য”।

বাংলাপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, অতীতে চৈত্র সংক্রান্তি মেলা উপলক্ষে  গ্রামাঞ্চলের হিন্দু গৃহস্থরা নাতি-নাতনিসহ মেয়ে-জামাইকে সমাদর করে বাড়ি নিয়ে আসত। গৃহস্থরা সবাইকে (মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনি) নতুন জামাকাপড় দিত এবং উন্নতমানের খাওয়া-দাওয়ারও আয়োজন করত। মেলার কয়েকদিন এভাবে তারা সবাই মিলে আনন্দ উপভোগ করত। বর্তমানে শহুরে সভ্যতার ছোঁয়া লাগায় আবহমান গ্রামবাংলার সেই আনন্দমুখর পরিবেশ আর আগের মতো নেই। তবে এখন শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব বা  মেলা বসে, যা এক সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

বাংলা উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, চৈত্র সংক্রান্তির প্রধান উৎসব  নীল পূজা বা  চড়ক পূজা। চড়ক পূজা, হলো গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এই উপলক্ষে একগ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করে এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলে। এ সময়ে শিব সম্পর্কে নানারকম লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়, যাতে শিবের নিদ্রাভঙ্গ থেকে শুরু করে তার বিয়ে, কৃষিকর্ম ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন সাধারণত আগুনে হাঁটা, শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে ঘোরাসহ প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হয়।

বৈসাবি উৎসব

পার্বত্য চট্রগ্রামের ১২টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (উপজাতি) লোকজন বাংলা বছরের শেষ দুই দিন এবং নববর্ষের প্রথম দিন (মোট তিনদিন) অতি আনন্দের সাথে তাদের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অণুষ্ঠান ‘বৈসাবি’ উৎসব পালন করে থাকে। ত্রিপুরাদের বৈসুক শব্দ থেকে ‘বৈ’, মারমাদের সাংগ্রাই থেকে ‘সা’ এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু ও বিষু শব্দদ্বয় থেকে ‘বি’ আদাক্ষরগুলোর সমন্বয়ে ‘বৈসাবি’ উৎসবের নামকরণ করা হয়েছে।

CHATRA SANGKRANTI-4

পার্বত্য চট্রগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন এই দিনটিকে নানা উৎসবের মাধ্যমে পালন করে। চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যারা  ‘বিষু’ ও অহমিয়ারা  ‘বিহু’ নামে পালন করে  থাকে  এই  উৎসব।  সব মিলিয়ে এর নাম রাখা হয় বৈসাবি। সবার লক্ষ্য একটাই পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করা।পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান উপজাতিদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতি সাধারণত এই উৎসব পালন করে থাকে।

এদিনে উপজাতিরা নতুন জামাকাপড় পরে অনুষ্ঠানে যোগ দেয়, পিঠা তৈরি, ঘর সাজানো, বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় গুরুদের জন্য ছোয়াইং (খাবার) দান, মৈত্রী পানি বর্ষনের (জলকেলি) বাঁধভাঙ্গা আনন্দ, সবমিলিয়ে পুরো জেলায় সব কটি সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যস্ত থাকে নতুন বছরকে বরণ করতে।

সাংগ্রাই

সাংগ্রাই উৎসব মারমা সম্প্রদায় পালন করে। এ উৎসব পাঁচ দিনব্যাপী চলে। ২৯ চৈত্র শুরু হয় এবং ৩ বৈশাখ শেষ হয়। ৩ বৈশাখ বৌদ্ধ মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা, ধর্মদেশনা শ্রবণ, শিল গ্রহণ ও উৎসর্গের মাধ্যমে সাংগ্রাইয়ের পাঁচ দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। সাংগ্রাই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন হচ্ছে মৈত্রী পানি বর্ষণ বা জলকেলি। এদিনে পাড়ায় পাড়ায় অবিবাহিত তরুণ তরুণীরা একে অন্যের গাঁয়ে পানি ছিটিয়ে বিদায়ী বছরের সব দুঃখ, বেদনা, গ্লানি, পাঁপ ও পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপড়েন ধুয়েমুছে নতুন বছরের জন্য একে অন্যের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে নেয়।

CHAITRO SANGKRANTI-1

বিজু

চাকমারা বিজু  উৎসব পালন করে থাকে ।  চাকমা রীতি অনুযায়ী ১২ এপ্রিল অর্থাৎ চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ গঙ্গ্যাদেবীর  উদ্দেশে নদীতে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সূচনা করা হয় ফুলবিজুর উৎসব। পরদিন ১৩ এপ্রিল মূলবিজু এবং ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ ও গোজ্যেপোজ্যা দিন উদযাপিত  হয় ।

বিষু

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় পালন করে বিষু বা বৈষু উৎসব। এ উপলক্ষে তাদের গ্রামগুলোয় আয়োজন করা হয় আকর্ষণীয় ঘিলা খেলা।

চৈত্র সংক্রান্তিতে দেশজুড়ে চলে নানা ধরনের মেলা, উৎসব। হালখাতার জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাজানো, লাঠিখেলা, গান, আবৃত্তি, সঙযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠান আর ভূত তাড়ানোর মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় চৈত্র সংক্রান্তি। নতুন বছরকে বরণের প্রস্তুতির পাশাপাশি শেষ দিনটিতে থাকে বর্ষ বিদায়ের নানা আয়োজন।

হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে

দেশের হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে চৈত্র সংক্রান্তির নানা উৎসবের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে বারোয়ারি মেলা অন্যতম। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, দিনাজপুরের ফুলছড়িঘাট এলাকা, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট ও ঢাকার সাভার, ধামরাইয়ে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে। রাজধানী ঢাকাতেও নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তি।

চৈত্র সংক্রান্তি হিন্দু এবং উপজাতিদের উৎসব। এ ধরনের উৎসব পালন করা মুসলমানদের জন্যে হারাম বা কবিরা গুনাহ। এ ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “যে কেউ কোনো কওমের (সম্প্রদায়) সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০৩৩)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button