Sunday , June 24 2018
Home / আলোচিত সংবাদ / এরদোগান: নায়ক থেকে মহানায়ক

এরদোগান: নায়ক থেকে মহানায়ক

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা: কবির কাব্যময়তায় ‘মসজিদ আমাদের ক্যান্টনমেন্ট, গম্বুজ আমাদের হেলমেট, মিনার আমাদের বেয়োনেট এবং বিশ্বাসীরা আমাদের সৈনিক’, মূলত এটি কোনো প্রথিতযশা কবির কবিতা বা কাব্যের অংশ নয়। এক অপরাজেয় সৈনিকের তেজস্বী উচ্চারণ। তুরস্কে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে এক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন এরদোগান। সে বিক্ষোভে এ কবিতাটি আবৃতি করে প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়েছিলেন। সে অপরাধেই তাকে ৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু নায়ক থেকে মহানায়ক হয়ে ওঠা মানুষকে কারানির্যাতন বা শৃঙ্খল দিয়ে আবদ্ধ করা সম্ভব? সম্ভব হয়নি এরদোগানের ক্ষেত্রেও। তিনি কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করে স্বমহিমায় আবির্ভূত হয়েছেন। সকল বাধা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা তার গতি এখন দুর্নিবার-দুর্বিনীত। কার সাধ্য তাকে লক্ষ্য বিচ্যুত করে? তিনি তুর্কি জাতির মুক্তির জন্য হাতে তুলে এক আলোকবর্তিকা। তার মধ্যে যে আলোর স্কুরণ ঘটেছে, তা কি কখনো প্রতিরোধ যোগ্য? কখনোই নয়। তাই কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তায়েপ এরদোগান এখন নায়ক থেকে মহানায়ক।
তিনি অতীতে নায়ক-মহানায়ক কিছুই ছিলেন না। জীবন-জীবিকার তাগিদে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় রাস্তায় লেবু বিক্রি করতেন তিনি। বাবাও আহামরি কিছু ছিলেন না; ছিলেন তুর্কি কোস্টগার্ডের সদস্য। এমনই এক অবস্থা থেকে মহাকব্যিক উত্থান, যা ইতিহাসে কদাচিৎও লক্ষ্য করা যায় না। এখন তিনি তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যারিশম্যাটিক নেতা। পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। ৬১ বছর বয়সী এই মানুষটি এবার তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে আরও একধাপ এগিয়ে গেছেন। আগামী দিনগুলো আরও কুসুমাস্তীর্ণই হবে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধা মহল।
সলক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তার দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) ১ নভেম্বরের নির্বাচনে আবারও একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ায় ১৩ বছরের শাসনকে আরও প্রলম্বিত করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি, যা কোন রাজনৈতিক বোদ্ধাই কল্পনা করতে পারেননি। ধারণা করা হয়েছিল যে, এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন একে পার্টির স্বাভাবিকভাবেই ভরাডুবি হবে। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে এরদোগানের দল আবারও স্বমহিমায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। বলা হচ্ছে, তুমুল জনপ্রিয়তার এ সুযোগ নিয়ে তুর্কিদের ওপর প্রভাবশালী নয়া সুলতান হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছেন এরদোগান। এবার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে মার্কিন স্টাইলের সর্বক্ষমতা সম্পন্ন প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন তিনি। এভাবে গণতান্ত্রিক উপায়েই এক ব্যক্তির শাসন ক্ষমতায় উচ্চাভিলাষী এরদোগান, যা বিশ্ব ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা। ১৯৫৪ সালে তুরস্কের কাসিমপাসায় জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষণজন্মা মহানায়ক। শৈশব কেটেছে কৃষ্ণসাগরের পাড়ে, অতিসাধারণভাবে। ১৩ বছর বয়সে আসেন ইস্তাম্বুলে। জীবিকার তাগিদে তিনি রাস্তায় বিক্রি করতেন লেবু, তিল ও ঝুটি। কিন্তু তিনি জীবনযুদ্ধে থেমে যাননি। চলেছেন অপ্রতিরোধ গতিতে। পড়ালেখায় মনোনিবেশ করলেন তিনি। তিনি উচ্চশিক্ষা নিলেন ব্যবসায় প্রশাসনে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে যোগ দেন ইসলামী আন্দোলনে। তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে জীবনোদ্দেশ্য হিসাবেই গ্রহণ করেন। খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অগ্রসেনানির ভূমিকা গ্রহণ করেন। ফলে তার জীবনের গতিধারা পাল্টাতে শুরু করে। অনেক বাধা-প্রতিবন্ধকতা তাকে অতিক্রম করতে হয়। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্যে অবিচল-বিরামহীন। এক সময়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, মেধা, যোগ্যতা, প্রত্যুতপন্নমতিত্ব ও দুরদর্শিতার কারণে ক্রমেই মহীরূহে পরিণত হন, যা গোটা বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
তিনি অবতীর্ণ হন নির্বাচন যুদ্ধে। আসে এক সময়োচিত ও বিরোচিত বিজয়। ১৯৯৪ সালে তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। আবির্ভূত হন এক করিৎকর্মা ও সব্যসাচী মেয়র হিসাবে। তখন ইস্তাম্বুল নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। নগরবাসীর জীবনযাত্রার ছিল খুবই নিম্নমানের। কিন্তু এরদোগানের সোনার কাঠি-রূপোর কাঠির জাদুকরী ছোঁয়ায় সবকিছু পাল্টাতে শুরু করে। দেড় কোটি মানুষের শহর ইস্তাম্বুলে তখন তিনি যানজট, বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট ও বায়ুদূষণ রোধ করে নগরের চেহারা পাল্টে দেন। নাগরিক সেবার পরসির বৃদ্ধি করা হয়। ইস্তাম্বুল পরিণত হয় এক সর্বাধুনিক মহানগরীতে, যা বর্তমান বিশ্বের জন্য রোল মডেল।
শুরু হয় এরদোগানের জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। তার দীর্ঘদিনের মিত্র আব্দুল্লাহ গুল ও অন্যদের সঙ্গে মিলে ২০০১ সালে একেপি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। অতি অল্পসময়ের মধ্যেই নতুন প্রতিষ্ঠিত দলটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। দেশের মানুষ একে পার্টিকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নেয়। ২০০২ সাল থেকে দলটি প্রতিটি নির্বাচনে জয়লাভ করে আসছে।
একে পার্টি ২০০২ সালে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে প্রথমবার ক্ষমতাসীন হয়। ২০০২ সালে একে পার্টি আসন পেয়েছিল ৩৬৩টি, ২০০৭ সালে ৩৪১, ২০১১ সালে ৩২৭ এবং ২০১৫ সালের জুন মাসের নির্বাচনে ২৫৮টি আসন। জুন মাসের নির্বাচনে সরকারের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন না পাওয়ায় কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হওয়ায় নভেম্বরে নতুন নির্বাচনের আবশ্যকতা দেখা দেয়। অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল বামপন্থী রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) ২০০২ সালে ১৭৮টি, ২০০৭ সালে ১১২, ২০১১ সালে ১৩৫, ২০১৫ সালের জুনের নির্বাচনে ১৩২টি আর সর্বশেষ নভেম্বরের নির্বাচনে ১৩৪টি আসনে বিজয়ী হয়।
২০০২ সালের নির্বাচনে একে পার্টি পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও কারাদ-ের অতীত থাকায় প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি দলনেতা এরদোগান। পার্লামেন্টে নতুন আইন পাসের মাধ্যমে ২০০৩ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। গত বছর প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে তুরস্কের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। লম্বা সিøম মধ্যবয়স্ক এরদোগান রাজনীতিতে এক ভিন্নধর্মী ইমেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার ব্যতিক্রমী চরিত্র মাধুর্য ও বিরল ব্যক্তিক তাকে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছতে সাহায্য করে। তিনি বিরল প্রতিভা ও অসাধারণ সাংগঠিনিক প্রজ্ঞার অধিকারী। ৩ বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন কোনো মুসলিম দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল সফরে গেলেন, তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতম পাঁচ মিত্র দেশের অন্যতম বলে উল্লেখ করলেন।
এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ঘোষণা দিলেন, একজন নেতা কীভাবে একইসঙ্গে ইসলামিক, গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারেন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলাম, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সমন্বিত করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি রোল মডেল সৃষ্টি করেছেন তিনি। কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের জনগণের ধর্মপালনের অধিকার কেড়ে নিয়ে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামী ঐহিত্য, তাহজিব-তমুদ্দুন ও চেতনা মুছে ফেলেছিলেন। এরদোগান সেই ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার বক্তব্য হলো, ধর্ম পালনে কাউকে যেমন বাধ্য করবেন না, তেমনি ধর্ম পালনে কেউ যেন বাধা দিতে না পারে সে ব্যবস্থা তিনি করবেন। এমন বক্তব্য একজন আদর্শ নাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই দেয়া সম্ভব।
তবে সমালোচকরা বলেছেন, অনেক আগেই তিনি গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে এসেছেন। ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে ১১৫০ রুমবিশিষ্ট বিলাসবহুল প্রেসিডেন্ট প্যালেস বানানো তার কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতালিপ্সার দৃষ্টান্ত। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের বৈদেশীক সম্পর্কবিষয়ক গবেষক আসলি আইদিনতাসবাস বলেন, নির্বাচনে একেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা এটাই নির্দেশ করে যে, জনগণ এরদোগানের কর্তৃত্ববাদী শাসন অনুমোদন করেছেন। এখন তিনি পুতিন স্টাইলে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করবেন। তুর্কিদের একাংশ এরদোগানকে ‘বুয়ুক উস্তা’ বা বড় মাস্টার বলে থাকেন। তিনি নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন সুলতান হিসাবে। কেউ কেউ বলে থাকেন, এরদোগান দ্য লাস্ট ডিক্টেটর।
মূলত এসব বক্তব্য এরদোগানের অবমূল্যায়ন ও বিদ্বেষ ছাড়া কিছু নয়। তিনি তো গণতান্ত্রিক উপায়েই ক্ষমতায় এসেছেন। তাহলে তিনি গণতন্ত্র থেকে সরে আসলেন কীভাবে। প্রেসিডেন্ট প্যালেস বানানো কী ক্ষমতালিপ্সার পরিচয় বহন করে? যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন তিনিই তো সে প্যালেসে বসবাস করার সুযোগ পাবেন। তার ডিক্টেটর হওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। কারণ তিনি এবং তার দল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই ক্ষমতাসীন।
গত জুনের নির্বাচনে এরদোগানের একে পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে ব্যর্থ হওয়ায় ছোট ছোট দলগুলোকে নিয়ে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করার চেষ্ট করা হয়। কিন্তু বামপন্থী ও সেকুলারিস্টদের অহমিকার কারণেই সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বামরা মনে করেছিল, নতুন নির্বাচন হলে একে পার্টির নিশ্চিত ভরাডুবি হবে। তুরস্কের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও তেমনটি আশা করেছিলেন। ঘটনার ধারাবাহিকতায় ও বাস্তব প্রেক্ষাপটে সংকট উত্তরণের জন্য নতুন নির্বাচনের কোনো বিকল্প ছিল না। সকল জল্পনা-কল্পনা, ভবিষ্যৎ ও বিশ্লেষণ ভুল প্রমাণ করে ১ নভেম্বরের নির্বাচনে একে পার্টির নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী ক্ষমতাসীনরা পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ লাভ করলো। জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) বহু কাক্সিক্ষত জয় পেল। সারা দুনিয়ার মিডিয়ার সব ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত করে প্রত্যাশার চেয়েও বড় বিজয় অর্জনের পর তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভুতুগ্লু টুইট করেছে মাত্র একটি শব্দে, যা তাবৎ বিশ্ব ইতিহাসের মাইলফলক। নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর এক শব্দের টুইট ছিল ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
এর আগে ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে একেপি পেয়েছে ৪৯.৭ শতাংশ ভোট। এতে মোট ৫৫০ আসনের পার্লামেন্টে দলটির সম্ভাব্য প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ৩১৭টি। গত জুনের নির্বাচনের চেয়ে প্রায় সাড়ে আট শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে একেপি। ওই নির্বাচনে দলটির প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪১ শতাংশ। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, গত নির্বাচনের চেয়ে এবার সারা দেশে একেপির ভোট বেড়েছে ৩০ লাখেরও বেশি। নির্বাচনে মোট ভোট কাস্ট হয়েছে রেকর্ডসংখ্যক ৮৭ শতাংশ।
নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট ২৫ শতাংশ পেয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ দল সিএইচপি। আগের নির্বাচনেও দলটির প্রায় সমপরিমাণ ভোট ছিল। আসনের হিসাবে গত নির্বাচনের ১৩২ চেয়ে মাত্র একটি কমেছে এবার। কুর্দি রাজনৈতিক দল এইচডিপি গত নির্বাচনের ১৩ শতাংশ থেকে কমে পেয়েছে ১০ শতাংশ ভোট। আসন সংখ্যা গতবারের ৮০ থেকে নেমেছে ৫৮-তে। সবচেয়ে বেশি ভোট হারিয়েছে বামপন্থী এমএইচপি। দলটির ভোট গত নির্বাচনের ১৬ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশ।
এদিকে নির্বাচনের ফল নিশ্চিত হওয়ার পর কুর্দি প্রধান কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ করেছেন এইচডিপির সমর্থকরা। কয়েকটি স্থানে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে জলকামান ব্যবহার করেছে। একই সময়ে তুরস্কজুড়ে বিজয় র‌্যালি বের করেছে এরদোগানের সমর্থকরা। বিজয় র‌্যালিতে ইসরাইল বিরোধী স্লোগান দিতে শোনা যায় বলে জানিয়েছেন সিএনএন।
একে পার্টির এই ঐতিহাসিক বিজয়ে তুর্কি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট মোস্তফা আকয়ল তার বিশ্লেষণে বলেছেন, ‘১ নভেম্বরের ফল একে পার্টির জন্য ছিল অনেক বড় ও অপ্রত্যাশিত বিজয়। গত জুলাইয়ের পর সন্ত্রাসী হামলা ছড়িয়ে পড়া এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবণতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। যারা দেশে স্থিতিশীলতা চেয়েছে তারা ১৯৯০ এরপর কোয়ালিশন সরকারের নেতিবাচক অভিজ্ঞতায় একক সরকার গড়তে একে পার্টিকে ভোট দিয়েছে’। বিবিসির বিশ্লেষণেও প্রায় একই কথার প্রতিধ্বনি করা হয়েছে, যা সম্ভব হয়েছে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তায়েপ এরদোগানের মেধা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব-সংগঠনিক গুণাবলী, দুরদর্শিতা, প্রত্যুতপন্নমতিত্ব, জনপ্রিয়তা এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রতি অবিচল আস্থার কারণে, যা গোটা বিশ্বকেই বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বোদ্ধারা মনে করেন, চলতি বছরের জুনের নির্বাচনের পর তুরস্কে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে তুর্কি জনগণ অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসের যে ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছিল তা থেকে রক্ষা পেতে এরদোগারের দলের ওপর আস্থা অটুট রেখেছিল। একে পার্টির নির্বাচনী স্লোগান ছিল স্থিতিশীলতা, অগ্রগতির, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং আইএস ও পিকেকের সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে তুরস্ককে সুরক্ষা করা। ফলে গণরায়টা একে পার্টির পক্ষেই গেছে। এখন এরদোগানের দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পুরোপুরি সক্ষম। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি করাও তাদের পক্ষে সম্ভব। যদিও সংবিধান সংশোধনের জন্য আরও বেশি আসনের আবশ্যকতা রয়েছে। এখন সংসদে প্রস্তাব পাস করার পর গণভোটের প্রয়োজন হবে।
তুরস্কের সাম্প্রতিক নির্বাচন, ঐতিহাসিক ফল ও এরদোগানের দলের নিরঙ্কুশ বিজয় বিভিন্ন দিকে থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। একে পাটি নতুন করে সরকার গঠন করতে সক্ষম হওয়ায় নতুন সরকার সিরিয়ায় করণীয় নির্ধারণ করতে পারবে। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক হামলার পর যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা মোকাবিলাল ক্ষেত্রে সরকারের শক্ত নৈতিক মনোবল এবারের নির্বাচনে তৈরি হয়েছে। পিকেকের কুর্দি জঙ্গি এবং আইএসের চলমান হুমকি মোকাবিলায় অতিসন্তর্পণে তারা অগ্রসর হতে পারবে। একইসঙ্গে মুদ্রার অব্যাহত মূল্যহ্রাস, রফতানিতে নেতিবাচক প্রবণতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে আসার মতো অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোতে পদক্ষেপ নিতে এবং তার যথাযথ সমাধান করাও সম্ভব হবে।
৫ কোটি ৪০ লাখ কুর্দি ভোটার এবার সংসদের ৫৫০ ডেপুটি নির্বাচন করেন। ভোটবদ্ধ তালিকার আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির আওতায় এই নির্বাচন ব্যবস্থায় বৃটিশ পদ্ধতির মতো এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করা সম্ভব হয় না। ফলে নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটে শতভাগ। এ ব্যবস্থায় ভোটাররা ভোট দেয় দলকে। আর আগে থেকেই দলের পক্ষ থেকে ডেপুটিদের তালিকা জমা দেয়া হয় নির্বাচন কমিশনে। কমিশন ভোট প্রাপ্তি হিসাবে ডেপুটিদের নির্বাচিত ঘোষণা করে।
সরকার গঠন করলেও নতুন সরকারকে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মিলিত প্রয়াস, আন্তরিকা, মেধা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সহজতর হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নতুন সরকারকে অবশ্যই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের আস্থা অর্জন ও পররাষ্ট্রনীতিতে অধিকতর গতিশীলতা আনা এখন তুর্কি রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে এখন যে বলয় বিভাজন ঘটেছে তাতে একেপির জয় গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য আনতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায়ও অসামান্য অবদান রাখতে পারে একে পার্টির সরকার। সিরিয়া সংকট ক্রমেই জটিল হতে জটিলতর হয়ে উঠেছে। ইরান ইয়েমেনকে ছাড় দিয়ে সিরিয়ায় বাশার আল আসাদকে মেনে নিতে সৌদি আরবকে রাজি করানোর চেষ্ট করছে। কিন্তু তিন লাখ নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিকে সৌদি আরব ও তুরস্ক কোনোভাবেই মানতে চাচ্ছে না। এই অবস্থান একে পার্টির জয়ের পর আরো জোরালো হবে। একে পার্টির বিজয় বিশ্বময় ইসলামী আন্দোলন নতুন গতি ও প্রেরণা লাভ করবে। হয়তো এই বিজয় আগামী দিনের বড় ধরনের বিজয়ের বার্তা বহন করছে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান নায়ক থেকে মহানায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ধারণা করা হয়েছিল, নবেম্বরের নির্বাচনে তিনি এবং তার দল হয়তো খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না। কিন্তু এরদোগানের বিচক্ষণ ও সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে জনগণ তার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পেরেছে। মূলত এরদোগানের এখানেই বড় সাফল্য। হয়তো আগামীদিনে আরও বড় সাফল্য অপেক্ষা করছে। তিনি মুসলিমবিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বমহিমায় আবির্ভূত হয়েছেন।

About banglamail71

Check Also

মহিলা ক্রিকেট দলের শিরোপা জয় উদযাপন করলো জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা।।(ভিডিও সহ)

মহিলা ক্রিকেট দলের শিরোপা জয় উদযাপন করলো জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা।।(ভিডিও সহ) Related