Thursday , October 18 2018
Home / আলোচিত সংবাদ / কোরীয় সংলাপে কেন রাজি হলেন উন?

কোরীয় সংলাপে কেন রাজি হলেন উন?

অপ্রত্যাশিত দ্রুততায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নতি, সৎ ভাইকে রাসায়নিক নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগে গুপ্তহত্যার নির্দেশ এবং প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও সন্দেহভাজন বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে নির্মম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে গতবছর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিলেন।তবে তিনি নতুন বছর শুরু করেছেন আক্রমণাত্মক কূটনীতিতে। এর মানে এই নয় যে, কিম তার কৌশলে পরিবর্তন আনছেন।গত সপ্তাহে দুই বছরে প্রথমবারের মত উত্তর কোরীয় কর্মকর্তারা তাদের দক্ষিণের প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংলাপে মিলিত হন। এর ফলাফল দাঁড়ায়- আগামী মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় শীতকালীন অলিম্পিকে উত্তর কোরিয়া দল পাঠাবে। আর দু’দেশের সামরিক বাহিনী পর্যায়ে সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়া।সংলাপ চালু হওয়া নিঃসন্দেহে লঘু হলেও ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। তবে এর মানে এই নয় যে, আরো শক্তিশালী বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত করতে পারবে এমন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ওয়ারহেড নির্মাণ কর্মসূচির গতি উত্তর কোরিয়ার শ্লথ করার ইচ্ছা আছে। বরং পিয়ংইয়ং মনে হচ্ছে, সুচিন্তিতভাবেই ওয়াশিংটন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের মাঝে একটি গোঁজ এঁটে দেওয়ার ক্রমবর্ধমান সফল কৌশল অনুসরণ করছে।

এই পদক্ষেপ কিম শাসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ অসম্ভব না হলেও এ ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানকে বেশ জটিল করে তুলেছে।১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধবিরতির সময়ে হওয়া দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পর থেকে সিউল এবং ওয়াশিংটন দীর্ঘ সময় মিত্র হিসেবে আছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনাদের অব্যাহত উপস্থিতিকে দেশটির টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হলেও একই সময়ে উভয়েরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার।ওয়াশিংটন এবং বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরই এটি পরিষ্কার করেছে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, উত্তর কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূমিতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করতে না দেওয়া। অপরদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যেই উত্তরের প্রচলিত, পারমাণবিক, সন্দেহজনক রাসায়নিক এবং জৈবিক অস্ত্রশস্ত্রের পাল্লার মধ্যে রয়েছে।

ফলে ওয়াশিংটন হয়তো তার ভূমিকে সম্ভাব্য ভবিষ্যত হুমকি থেকে রক্ষা করতে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ঝুঁকিও নিতে পারে। কিন্তু, সিউলের এমন ধ্বংসাত্মক কৌশল গ্রহণের কোনো অভিলাষ নেই।দক্ষিণ কোরিয়ার আপস আলোচনাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনায় কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তকরণ বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার নিরস্ত্রীকরণকেই তাদের কূটনৈতিক প্রস্তাবের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।যদিও উত্তর কোরিয়া বলছে, এবারের সংলাপে এমন কোনো বিষয় আলোচ্য ছিল না। তবে দেশটির আপস আলোচনাকারীদের প্রধান জানাচ্ছেন, উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রাগারে এমন অস্ত্র রাখা আছে, কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাক করে, দক্ষিণ কোরীয় ‘ভাইদের’ জন্য নয়।সত্য হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে উত্তর কোরিয়া কতদূর পর্যন্ত সরিয়ে দিতে পারে তারও তাৎপর্যপূর্ণ সীমারেখা আছে।দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন জায়ে ইন মে উত্তরের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে তার পূর্ববর্তীদের চেয়ে অনেক বেশি উদারতা দেখিয়েছেন। কিন্তু, সমস্যার বিষয় হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়া নিজের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনা উপস্থিতি ও অস্ত্র সরবরাহের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।

কিছু কিছু বিশ্লেষক অবশ্য সন্দেহ করছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার এই কূটনৈতিক উৎসাহ মূলত আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শীতকালীন অলিম্পিকের সময় সম্ভাব্য উত্তর কোরীয় সন্ত্রাসী হামলা অথবা সাইবার আক্রমণের কারণে উদ্ভূত যেকোনো ধরনের বিব্রতকর ঘটনা এড়ানো। এরপর সম্পর্ক ভাল থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। গেমস শেষ হওয়ার পরপরই হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের যৌথ সামরিক মহড়া পুনরায় শুরু করে দেবে।অলিম্পিককে সামনে রেখেই অবশ্য এ ধরনের মহড়া আপাতত বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছে সিউল। কিন্তু, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সামরিক কমান্ডাররা মনে করেন, যেকোনো ভবিষ্যত হামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে এসব কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র যেমন তীব্রভাবে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করেছে বিশেষত প্রয়োজন পড়লে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ক্ষেত্রগুলো গুড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে চালানো আকাশ মহড়াগুলো, দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভবত এসব কমিয়ে আনতে চাইছে।এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া যদি বন্ধ হয়ে যাওয়া দু’দেশের সীমান্তে অবস্থিত কয়েকটি যৌথ অর্থনৈতিক অঞ্চল পুনরায় খুলে দেওয়ার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ঘনিষ্ঠ হয় তাতে ওয়াশিংটন হয়তো নাখোশই হবে।কারণ, পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক উচ্চাভিলাষ কমাতে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ফেলার কৌশল নিয়েছে।এই কৌশল ইতোমধ্যেই বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে। কারণ, উনের আচরণে হতাশ হয়ে চীন যখন মোটাদাগে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পালন করছে তখন পুতিনের রাশিয়া পিয়ংইয়ংয়ের জন্য ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।সত্য হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার বিবিধ লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখছে।গত বছর সিউল সফরের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার অসামরিক অঞ্চলে যেতে পারেননি। তবে দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তারা তাকে হেলিকপ্টারে চড়িয়ে এটা দেখিয়েছিলেন যে, দেশটির রাজধানীর অবস্থান উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে। এটা দ্বারা বোঝানে হয়েছে, সিউল ভালভাবেই কিমের কামানের পাল্লার মধ্যে আছে এবং পেন্টাগনের চালানো সমীক্ষা সতর্ক করে দিয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ ছাড়াই সেদিনে ২০ হাজার দক্ষিণ কোরীয় নাগরিককে হত্যা করতে পারবে।অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া ট্রাম্পকে দেখাতে চেয়েছে যে, পুনরায় যুদ্ধকে উসকে দিতে পারে এমন কোনো কিছুই তার করা উচিত হবে না।দক্ষিণ কোরিয়া এবং ট্রাম্প প্রশাসন উভয়েই পিয়ংইয়ংকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখবে এমন কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ারের সন্ধান করছে।

শোনা যায়, গত বছর সিউল সফরে গিয়ে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট মুনকে উপদ্বীপের পুনঃএকত্রীকরণ প্রকল্প বন্ধ করতে এবং কিম শাসনের অবসান ঘটানোর পদক্ষেপ নিতে বলেছেন।দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন এটা সম্ভব নয়। কারণ, দেশটি রাজনৈতিকভাবেই পুনঃএকত্রীকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও কম সংখ্যক মানুষই এর আসন্ন সম্ভাবনা আছে বলে বিশ্বাস করেন।উত্তর কোরিয়াও একইভাবে বাগাড়ম্বরপূর্ণ ‘পুনঃএকত্রীকরণ’ শব্দ ব্যবহার করে। তবে বহু বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, এটা হলে কেবল কিম শাসনামলেই হতে পারে এবং সেটা সামরিকদখলদারিত্বের মাধ্যমে। এই একটি কারণে দক্ষিণ কোরিয়া অসম্ভাব্যভাবে তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে আসছে প্রকৃতপক্ষে, বহু দক্ষিণ কোরীয় বিশ্লেষকের এখন প্রধান দুশ্চিন্তা- যুক্তরাষ্ট্রে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হামলার আশংকার কারণে ওয়াশিংটন হয়তো দক্ষিণ কোরিয়াকে একা ফেলে রেখে উপদ্বীপ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে অথবা দুই কোরিয়ার মধ্যে কোনো সংঘাত লাগিয়ে দেবে।এই সপ্তাহের কূটনৈতিক পরিশোধন অনেকটা নিশ্চিতভাবেই উত্তর কোরীয় সাইবার হামলায় শীতকালীন অলিম্পিকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশংকাকে কমিয়ে দিয়েছে। এটা হয়তো কিমকে আগামী মাসগুলোতে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হতে কিছুটা হলেও অনুৎসাহিত করবে। তবু বিদ্যমান সংকটের স্থায়ী সুরাহায় এখন পর্যন্ত তারা যথেষ্ট কিছু করেনি।

About editor

Check Also

দুর্ঘটনার ওপর কারও হাত নেই – জাফর ইকবাল

আমি দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। মাঝে মাঝেই আমি খবরের কাগজের কোনো কোনো খবর পড়ার সাহস পাই …