নামের শেষে মাদানী লাগাতে হবে এটা কোথায় পেয়েছেন ? মাদানীকে আমীর হামজা (ভিডিওসহ​)

নামের শেষে মাদানী লাগাতে হবে এটা কোথায় পেয়েছেন বলে মতিউর রহমান মাদানীকে প্রশ্ন করেছেন মুফতি আমীর হামজা । তিনি বলেন লাক্বাবধারীরা জাহান্নামে যাবে। উল্লেখ্য,যারা মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে সমাজ ও জাতির বিশেষ করে ইসলামি খেদমত আন্জাম দিয়ে যাচ্ছেন তাদের অনেকেই তাদের নামের শেষে এই ঐতিহ্যবাহি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে সম্বন্ধ করে “মাদানী” উপাধি ব্যবহার করেন। আরবীতে যাকে “লাক্বাব” বলে। এটাতে দোষনীয় বা অহংকারের কিছু নেই। শুধু নিজের পরিচিতি বা স্বাতন্ত্রতার জন্য অথবা ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁরা লেখাপড়া করেছেন, ফলে তারপ্রতি অন্তরের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। কারণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করেনঃ হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, তারপর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সহিত পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। (সূরা হুজরাতঃ১৩)

সুতরাং এই “মাদানী” উপাধি অহংকার বা অন্য কোন কারণে তাঁরা লিখেন না। শুধুই পরিচিতির জন্য।

প্রশ্নঃ মানুষের আসল নামের সাথে অন্য কোন নাম লাগিয়ে পরিচিতি হওয়াটা কি জায়েয?

উত্তরঃ হ্যাঁ জায়েয। কারণ এটা সর্বযুগে সকল মানুষের মাঝে এর প্রচলন ছিল এবং এখনও আছে।

প্রশ্নঃ প্রমাণ কি?

উত্তরঃ প্রমাণ হলো; প্রতিটি মানুষের একটি নাম থাকে, যাকে আমরা বলতে পারি আসল বা প্রকৃত নাম। ঐ আসল নামের সাথে আরও দুটি জিনিসের ব্যবহারও লক্ষ করা যায়, যার একটিকে “কুনিয়াত” বা উপনাম এবং দ্বিতীয়টি হল; “লাকাব’’ বা উপাধি। মানুষের আসল নামের সাথে সাথে এই দুটি নামের ব্যবহারও মানুষের সৃষ্টি লগ্ন থেকেই দেখা যায়। যেমন আদম আলাইহিস সালামের উপনাম ছিল “আবুল বাশার” ইবরাহিম আলাইহিস সালামের উপনাম ছিল “আবুল আম্বিয়া” এবং উপাধি ছিল “খালীলুল্লাহ”। মূসা আলাইহিস সালামের উপাধি ছিল “কালীমুল্লাহ” ইসমাঈল আলাইহিস সালামের উপাধি ছিল “যাবীহুল্লাহ” । ঈসা আলাইহিস সালামের উপাধি ছিল “আল-মাসীহ। আর আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপনাম ছিল “আবুল কাশেম” এবং উপাধিও ছিল অনেক, যেমন; নবুওয়তের পূর্বে তাঁর উপাধি ছিল, আল-আমীন বা “আস্ সাদেক্বুল আমীন”। নবুওয়তের পরে “আহমাদ, আল-মুসত্বফা, আল-বাশীরুন নাযীর, সিরাজুল মুনীর।

খালীলুল্লাহ, কালীমুল্লাহ, যাবীহুল্লাহ, আল-মাসীহ, আল-আমীন, আস্ সাদেক্বুল আমীন, আহমাদ, মুসত্বফা, আল-বাশীরুন নাযীর, সিরাজুল মুনীর, এগুলো সব লাকাব বা উপাধি।

প্রশ্নঃ এগুলো তো ইসলামের পূর্বের ইতিহাস, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে কি এমন উপাধি লাগানোর প্রচলন ছিল বা তিনি নিজে কাউকে এমন উপাধি বা উপনামে ডেকেছেন?

উত্তরঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁর অনেক সাহাবাকে বিভিন্ন উপনাম ও উপাধি প্রদান করেছেন এবং সে নামে তিনি নিজেও ডেকেছেন;

যেমন আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রকৃত নাম ‘আব্দুর রহমান বিন সাখর আদ-দাওসী” কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে একদিন “আবু হির” বলে ডাকলে সেদিন থেকে সবাই ঐ নামে ডাকা আরম্ভ করেন। “হুরায়রাহ” শব্দটি হির্রাতুন এর তাসগীর, হির্রাহ মানে বিড়াল, আর হুরায়রাহ বিড়াল ছানা, তাহলে তার নামের অর্থ দাঁড়ালো “বিড়াল ছানার পিতা”। সে কি আসলেই বিড়াল ছানার পিতা?

এমনি ভাবে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপনাম “আবু হাফস” আর উপাধি ছিল “ফারূক”।

আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রকৃত নাম ‘আব্দুর রহমান” আর উপাধি ছিল “সিদ্দীক ও আতীক”।

উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপাধি “যুন্ নূরাইন”।

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার উপনাম “উম্মুল মূমিনীন”।

আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপনাম ছিল “আবু তুরাব”।

প্রশ্নঃ “কুনিয়াত” তথা উপনাম ও “উপাধি” তথা লাক্বাব কাকে বলে?

উত্তরঃ প্রথমতঃ “কুনিয়াত” বা উপনামঃ পুরুষ মানুষের্ ক্ষেত্রে নামের প্রথমে “আবু” আর মহিলাদের ক্ষেত্রে নামের প্রথমে “উম্ম” যোগ করে যে নাম রাখা হয় তাকে ‘কুনিয়াত’ বা উপনাম বলে। যেমন কারো ছেলের নাম মুয়ায হলে তার পিতাকে আবু মুয়ায বলে ডাকা, আর মা-কে উম্মে মুয়ায বলে ডাকা। অথবা মেয়ের নাম সালমা হলে তার পিতাকে আবু সালমা উপনামে ডাকা, আর তার মা-কে উম্মে সালমা উপনামে ডাকা।

সাধারণভাবে বড় সন্তানের দিকে সম্বন্ধ করেই বেশি উপনাম হয়, তবে তা জরুরী নয়। আবার কারো সন্তান না থাকলেও তাকে এমন উপনামে ডাকা জায়েয, যেমন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার উপনাম ছিল “উম্মে আব্দিল্লাহ” অথচ তাঁর কোন সন্তানই ছিল না। অনুরূপ “আবু বকর” (রাযিয়াল্লাহু আনহুর) এটা তাঁর উপনাম, তাঁর আসল নাম ‘আব্দুর রহমান” অথচ বকর নামে তার কোন সন্তানই ছিল না।

দ্বিতীয়তঃ “উপাধি” তথা লাক্বাব; মানুষের আসল নামের সাথে পরিচিতি বা পার্থক্য বা প্রশংসা বা দুর্ণামের জন্য অন্য আরেকটি যে নামে তাকে ডাকা হয় তাকে লাক্বাব বা উপাধি বলে। তবে দূর্ণামের জন্য বা দুর্ণামজনক নাম, উপনাম বা উপাধি রাখা বা ডাকা নিষিদ্ধ যা ইসলামে হারাম করা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে “আবু” বা “উম্ম” যোগ ব্যতীত উপনাম হয় না।

কোন ব্যক্তির একাধিক উপনাম বা একাধিক উপাধি যেমন জায়েয তেমনি একই ব্যক্তির আসল নামের সাথে উপাধি ও উপনাম রাখাও জায়েয। যেমন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম; আবু হাফস ওমার বিন খাত্তাব আল-ফারূক। আবু হাফস তাঁর উপনাম, ওমার বিন খাত্তাব তাঁর আসল নাম, আর আল-ফারূক তাঁর উপাধি।

প্রশ্ন; কোথাও জন্মগ্রহণ না করলে কি ঐ জায়গার দিকে সম্বন্ধিত করে কারো উপাধি লাগানো জায়েয?

উত্তরঃ কেউ কোন স্থানে জন্মলাভ করলেই যে শুধু তিনিই ঐ জায়গার দিকে সম্বন্ধ করে তার উপাধি গ্রহণ করবেন তা সঠিক নয়। কারণ উপাধি লাগানোর এমন কোন শর্ত নেই। বরং উপাধি লাগানোর অনেক কারণ আছে?

প্রশ্ন এই উপাধি লাগানোর সম্বন্ধগুলো কি কি হতে পারে?

১. বংশ বা গোত্রের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি হতে পারে, যেমন;

(ক) মাখযূমী বংশের দিকে সম্বন্ধ করে উপাধি; বিশিষ্ট সাহাবী আবু সালামা আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আসাদের উপাধি “মাখযূমী”।

(খ) ক্বাহতানী বংশের দিকে সম্বন্ধ করে উপাধি; হিসনুল মুসলিম নামক দোয়ার কিতাবের লেখক সাঈদ বিন আলী বিন ওহাফ “আল-ক্বাহতানী”।

(গ) খাযরায বংশের দিকে সম্বন্ধ করে বিশিষ্ট সাহাবী আনাস বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপাধি “খাযরাযী”

(ঘ) আমাদের দেশে বংশের দিকে অনেক উপাধির প্রচলন আছে যেমন- তালুকদার, সর্দার, মুন্সি, চৌধুরি, খাঁ, খান, মন্ডল, সিদ্দীক, সাহেব ইত্যাদি।

২. জন্মগ্রহণের জায়গা, স্থান, গ্রাম, শহর বা দেশের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি হতে পারে, যেমন;

(ক) শফিউর রহমান মুবারকপুরী (মুবারকপুর একটি গ্রাম)

(খ) শামসুদ্দীন আযিমাবাদী (আযমগড় একটি শহর বা এলাকা)

(গ) সিদ্দীক হাসান খান ভূপালী ( শহর, যা এক কালের প্রদেশ)

(ঘ) ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল আল্-বুখারী (শহর বা অÂল)

(ঙ) আল্লামা শায়েখ নাসিরুদ্দিন আলবানীর জন্ম আলবেনিয়ার শকোদের নামক গ্রামে।(আলবেনিয়া ইউরোপের একটি দেশ)

৩. জন্মগ্রহণ করেননি কিন্তু পরবর্তীতে কিছুদিন বসবাস করেছেন এমন জায়গা, স্থান, গ্রাম, শহর বা দেশের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি হতে পারে, যেমন;

(ক) মুবারাক বিন হাস্সান আস-সুলামী তার উপাধি আল-বাসরী (জন্মসূত্রে বসরার অধিবাসী) অতঃপর মক্কা আসেন তাই তাকে আরেকটি উপাধি দেয়া হয় “আল-মাক্কী”। (সূত্র; তাহযীবুত-তাহযীব; ১০/২৬)

(খ) আবু ইসহাক ইবরাহীম বিন মানসূর শাফী মাযহাবের ফাক্বীহ ফলে মাযহাবের দিকে সম্বন্ধিত করে তার উপাধি হয় “শাফেয়ী” এবং জন্মসূত্রের দিকে সম্বন্ধিত করে তার উপাধি “মাসরী” বা “মিসরীয়” কিন্ত কাজ করার জন্য কিছু দিনে জন্য বাগদাদ ছিলেন তাই ঐ দিকে সম্বন্ধিত করে তার উপাধি হয় “ইরাকী”। (সূত্র; অফায়্যাতুল আ‘ইয়ান; ১/৩৩)

(গ) ফজল বিন সাহাল আল-ইসফারা‘ইনী তার উপাধি সিরিয়ার রাজধানীর দিকে সম্বন্ধিত করে তার উপাধি হয় “দামেশক্বী”। অথচ তিনি দামেশক্বে জন্মগ্রহণ করেননি। তাঁর জন্ম “মিসরে” শৈশব কাটে ফিলিস্তিনের বায়তুল মাক্বদাসের আশে পাশে, পরে ব্যবসার জন্য ইরাক ও খোরাসান সফর করেন। আর কিছু কাল শামের “হালব” নামক শহরে অবস্থান করার সুবাদে তার দিকে সম্বন্ধিত করে তার উপাধি হয় “দামেশক্বী”।(সূত্র; তারিখুল ইসলাম; ১৬/ ২৮৯)

৪. কোন জায়গায় পড়াশোনা করার কারণে ঐ জায়গার দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি হতে পারে, যেমন;

ইমাম ও কাজী আবু হামেদ আহমাদ বিন বিশর আল-আ‘মেরী আল-মরূরুযীর উপাধি ছিল “বসরী” অথচ তিনি বসরা নগরীর অধিবাসী ছিলেন না। তাঁর জন্ম “মরূযী” নামক পূর্ব ইরানের পূর্ব-উত্তরে অবস্থিত খোরাসান অÂলের একটি গ্রাম বা শহর। সেখানে তিনি গমন করেছিলেন পড়াশোনা করার জন্য। তিনি মাযহাব সম্পর্কিত কিতাব “আল-জা‘মে”, ইমাম মুযানী রাহিমাহূল্লাহর “মুখতাসার” কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ এবং ঊসূলে ফিকহের উপর কিতাব রচনা করেন। বসরা নগরীর ফক্বীহগণ তাঁর কাছে শিক্ষার্জন করেন। (দেখুন; তাহযীবুল আসমা ওয়াল-লুগাত; ২/২১১)

৫. মাযহাবের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা; যেমন-

(ক) হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ মোল্লা আলী কারীর উপাধি হানাফী মাযহাবের দিকে সম্বন্ধিত করে রাখা হয় “হানাফী”।

(খ) আবু ইসহাক ইবরাহীম বিন মানসূর শাফী মাযহাবের ফাক্বীহ ছিলেন, ফলে মাযহাবের দিকে সম্বন্ধিত করে তার উপাধি হয় “শাফেয়ী”।(সূত্র; অফায়্যাতুল আ‘ইয়ান; ১/৩৩)

(গ) যায়নুদ্দীন আব্দুর রহমান বিন আহমাদ বিন রাজাব, তাঁর উপাধি ছিল গোত্রের দিকে সম্বন্ধিত করে “সালামী” জন্মভুমির দিকে সম্বন্ধিত করে “বাগদাদী” অতপর জীবনকাল অতিবাহিত করেন এবং মৃত্যবরণ করেন সিরিয়ার রাজধানী দামেশকে, যার করনে সেদিকে সম্বন্ধিত করে “দামেশকী”, হাম্বলী মাযহাবের হওয়ার কারণে মাযহাবের দিকে সম্বন্ধিত করে “হাম্বালী”। এছাড়া তাঁকে আরও অনে উপাধিতে ভূষিত করা হতো, যেমন- বক্তা, ইমাম, হাফেজ, ফাক্বীহ এবং মুহাদ্দীস। (দেখুনঃالموسوعة العربية العالمية http://www.mawsoah.net)

৬. পেশা বা ভাল কর্মের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা হয়, যেমন-

(ক) মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপাধি “কাতিবুল ওহী” ছিল।

(খ) বিচারকদের বিচার-ফায়সালার দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা হয়, “কাজী” বা “বিচারক”।

(গ) শিক্ষকতার দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি বলা হয়, “শিক্ষক”।

(ঘ) হাদীস বিশারদ বা পাঠদানের দিকে সম্বন্ধিত করে বলা হয়, “মুহাদ্দিস”।

(ঙ) কুরআন মুখস্থ করার কারণে বলা হয়, “হাফেজ”।

৭. বিশেষ ভাল কাজের বা অবদানের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা হয়, যেমন-

(ক) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাগণ মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলে মদীনাবাসীগণ তাঁদের সাহায্য-সহযোগিতা করেন যার কারণে তাদের উপাধি হয় “আনসার”

(খ) আর যারা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন তাদের উপাধি “মুহাজির”।

(গ) বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের নামের শেষে উপাধি দেয়া হয় “বদরী” সাহাবী।

৮. কোন বিষয়ের উপর ডিগ্রী অর্জনের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা হয়, ডক্টর, প্রফেসর, প্রকৌশলী।

৯. বিশিষ্টজনের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা হয়,

(ক) যেমন- বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপাধি “রাসূলের মুয়ায্যিন”।

(খ) আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপাধি “খাদিমু রাসূলিল্লাহ” বা রাসূলের খাদেম।

১০. কেউ কারো হাতে মুসলমান হলে অথবা কেউ কাউকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করলে তার দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা হয়, যেমন-

(ক) বিশিষ্ট সাহাবী সালেম বিন মা‘কাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আবু হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু দাসত্ব থেকে মুক্ত করার কারণে তার দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা হয়, “আবু ‍হুযায়ফার মুক্ত দাস” আরবী বলে; মাওলা আবী হুযায়ফা”। পরবর্তীতে তিনি তাকে ভাই ও বন্ধু বানিয়েছিলেন। সালেম ছিলেন দক্ষিণ ইরানের একটি অÂলের অধিবাসি।

(খ) বিশিষ্ট তাবেয়ী আব্দুল্লাহ বিন দীনারের উপাধি “মাওলা ইবনে ওমার” বা ইবন ওমরের মুক্ত দাস।

(গ) বিশিষ্ট তাবেয়ী না‘ফের উপাধি “মাওলা ইবনে ওমার” ছিল। আব্দূল্লাহ বিন ওমার কোন এক যুদ্ধে গনীমতের ভাগে তাকে পেয়েছিলেন, পরবর্তীতে তিনি তাকে আযাদ করে দেন। এমনকি তিনি মদীনার ফকীহ ছিলেন এবং ওমর বিন আব্দুল আযীয তাঁকে মিসর পাঠিয়েছিলেন সেখানে সুন্নাহ শিক্ষা দেয়ার জন্য। তার পরেও তাঁর উপাধি ইবনে ওমরের মুক্ত দাস থেকেই যায়। (তাহযীবুত তাহযীব;১০/৪১৪)

১১. যে কোন ভাল গুণ বা বিশেষ বৈশিষ্টের দিকে সম্বন্ধিত করে উপাধি রাখা; যেমন-

(ক) যুবাইর বিন আউয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহুকে “হাওয়ারীর রাসূল” উপাধি দেয়া হয়।

(খ) জা‘ফার বিন আবী তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে “যুল জানাহাইন বা দু, বাহু ওয়ালা” উপাধি দেয়া হয়। কারণ, মূতার যুদ্ধে তিনি ডান হাতে পতাকা বহন করছিলেন, ডান হাত কর্তিত হলে বাম হাতে পতাক বহন করেন, বাম হাতও কর্তিত করা হলে দুই হাতের বাহু দ্বারা তা বহন করেন, শেষ পর্যন্ত তাকেও শহীদ করা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন; এর বিনীময়ে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে এমন দুটি বাহু দান করবেন যাদ্বারা তিনি জান্নাতে যেথায় ইচ্ছা হয় উড়ে বেড়াবেন।যার করণে তাঁর আরেকটি উপাধি হলো; “ত্বয়্যার” বা “উড়ন্ত”।

(গ) হানযালা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে “গাসীলূল মালাইকাহ” বা “ফেরেশতা কর্তৃক ধৈত” উপাধি দেয়া হয়।

(ঘ) অন্য এক সাহাবীকে “যুল ইয়াদাঈন” উপাধি দেয়া হয়।

১২. কোন কারণ ছাড়াও যে কোন ব্যক্তিকে যে কোন উপাধিতে ভূষিত করা যায়। তবে শর্ত হলো উপাধি যেন খারাপ বা নিন্দনীয় বা শরীয়ত বিরোধি না হয়। যাকে উপাধি দেয়া হবে তিনি যেন তা না পছন্দ করেন বা অপমানবোধ না করেন।

১৩. আমাদের দেশের অনেক বড় বড় ও প্রখ্যাত আলেমগণ যারা দিল্লী জা‘মেয়া রাহমানিয়া থেকে ফারেগ হয়ে আসেন তাদেরকেও “রাহমানী” উপাধি লিখতে দেখা যায়। যেমন- আল্লামা হাবীবুল্লাহ খান রাহমানী, আল্লামা মুনতাসীর আহমাদ রাহমানী, হাফেজ আনীসূর রহমান রাহমানী, আল্লামা আব্দুল মান্নান বিন হেদায়েতুল্লাহ মুর্শিদাবাদী, রাহমানী, এছাড়া আরও অনেকে।

১৪. ভারতের উত্তর প্রদেশের শাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে অবস্থিত “দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার দিকে সম্বন্ধিত করে “দেওবান্দী” উপাধি বলা হয় । এই মাদ্রাসাটি ১৮৬৬ সালে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ইসলামি পন্ডিত প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি তাদের প্রধান ছিলেন। যার কারণে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠাতা প্রধানের দিকে সম্বন্ধিত করে “কাসেমী” উপাধিও গ্রহণ করে।

উপসংহারঃ

সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট জানা গেল যে, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের সেই মাদীনাতুর রাসূল বা নবীর শহরে অবস্থিত ঐতিহাসিক মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্জনের কারণে তার দিকে সম্বন্ধিত করে “মাদানী” উপাধি লেখা আশ্চর্যের বা দোষের কোন কিছু তো নয়ই, বরং তা নি:সন্দেহে জায়েয এবং তা শরীয়ত সমর্থিত।

সুতরাং মানুষের আসল নামের সাথে আগে ও পিছে উপনাম ও উপাধি দেয়াটা শরীয়ত সমর্থিত তথা জায়েয। এটাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ বা ব্যঙ্গ করা কোন মুসলিমের বৈশিষ্ট না। আল্লাহ তায়ালা বলেন: আর তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করিও না, এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপাধি দিয়ে ডাকিও না; ঈমানের পর মন্দ উপাধি ধরে ডাকা অতি মন্দ। যারা তাওবা না করে তারাই যালিম। (সূরা হুজরাতঃ১১)

এই আসল নামের সাথে সাথে আগে-পিছে উপনাম ও উপাধি ব্যাবহার শুধু মুসলিমরাই করেন না বরং পৃথিবীর সকল দেশের সকল ধর্ম ও মতের মানুষেরাও এটি ব্যাবহার করেন। এটাকে “লেজ” নয় (প্রসঙ্গঃ “লেজ” এই স্ট্যাটাস্টি আমি পড়েছি), বরং আরবীতে “কুনিয়াত” বাংলাতে উপনাম বা ডাক নাম এবং ”লাক্বাব” বাংলাতে উপাধি বলে। অহংকার করে নয়, বরং সবাই এটি পরিচিতি স্বরূপ ব্যবহার করেন।

বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন উপাধি লাগাচ্ছে বা ব্যবহার করছেন, তাতে কারো কোন সমস্যা হলো না, ১৮৬৬ সালে দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে ঐ মাদ্রসার দিকে সম্বন্ধ করে “দেওবান্দী, ওলামায়ে দেওবান্দ, দেওবান্দী আন্দোলন, দেওবান্দী আক্বীদা, কত রকম উপাধি ব্যবহার হয়েছে এবং হচ্ছে, তাতে কোন দিন কারো মাথা ব্যাথা হয়নি। কিন্তু সমস্যা আরম্ভ হলো যখন মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্জনের পর সেখান থেকে ফিরে এসে তারা নামের শেষে “মাদানী” লিখলেন, তখন সকল বিদআতীদের ঘুম হারাম হয়ে গেল। কেন তারা মাদানী লেখেন? ফুলতলী, আটরশী, সায়দাবাদী, দেওয়ানবাগী, দেড় হাজারী, কোকিল পাখী, ফারাজী, সাইফী, মাইভান্ডারী, কত উপাধি তার কোন হিসাব নেই। এগুলোতে কোন সমস্যা হয়নি। আজকাল সহী আক্বীদার দাবিদার কিছু ভাইও এর পিছনে চরম ক্ষুব্ধ; কেউ কেউ স্ট্যাটাস দিচ্ছেন “‘আমার সাথে উমুকের তারপর দুটি উপাধি ১. মুফতি ২. মীর তারপর নাম বলে আবার আরেকটি উপাধি ৩. সাইফী সাহেবের সাথে দেখা হলো, তারপর লিখছেন; উল্লেখ্য, উনি মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্জনের পরেও নামের শেষে “মাদানী’” লিখেন না। দেখুন কতবড় হিংসা!!! নামের আগে ২টি উপাধি, আর নামের পরে আরেকটি উপাধি, মোট ৩টি উপাধি বলার পরও তিনি কত আনন্দিত যে উনি ““মাদানী”” লিখেন না!!! উনার মাদানী লিখার জায়গা কোথায়? যার তিনটি উপাধি? এগুলো কি উপাধি লিখার বিপক্ষের কথা? না শুধু “মাদানী” উপাধির বিরোধিতা করা? জেনে হোক বা না জেনে হোক এক শ্রেনীর লোকেরা শুধুই এর বিরোধিতা করছে কারণ কি?

আসল কারণ হলো; ঐতিহাসিক মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্জনের পরে যখন সেই দামাল ছেলেরা সম্পূর্ণ নতুন উদ্যোমে বাংলার মাটিতে শিকড় গাড়া শিরক ও বিদআতের মত জঘন্য পাপ থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন শিরক ও বিদআতী ও দরবারি ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ী আলেমরা তাদের মুখোষ উম্মচিত হয়ে পড়ার ভয়ে “মাদানী” আলেমদের এই দাওয়াতী কার্যক্রমকে বন্ধ করার জন্য বা সাধারণ মুসলিমদেরকে তাদের থেকে দূরে রাখার জন্য এসব বলে বেড়াচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের মুসলমানরা মাদানী আলেমদেরকে এতটাই ভালবেসে ফেলেছে যে, তা আর ভাষায় প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। তারা আজ হক্ব-বাতিলের পার্থক্য নির্ণয় করে ফেলেছে। যার ফলে ঐ ভন্ডদের হালকা-যিকিরের আসর আর আগের মত জমে উঠছে না। এমনকি ঐ সব ভন্ডদের তাবিজ-কবজ আর মোমবাতী-আগরবাতী, হালুয়া রুটি ও মিষ্টির গন্ধে মুখরিত রমরমা জশনে জুলুশে ঈদে মীলাদুন্নবীর আসল গুরু রহস্য প্রকাশ হয়ে গেছে। তাই তারা চিন্তিত হয়ে পড়েছে।

বানোয়াট ও কাল্পনিক গল্প বা কিচ্ছা কাহিনী এবং স্বপ্নের মাধ্যমে পাওয়া ঐ গাঁজাখুরি বক্তাদের সুলোলিত কন্ঠের শ্রোতা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে, তাই তারা আজ ঐক্য-বদ্ধ হয়ে মাদানীদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত। তাই তারা “মাদানী” শব্দের তিন অক্ষরের উপাধিকে খুবই ভয় পাচ্ছে। আর তাদের সাথে সূরে সূর মিলাচ্ছে আবেগে আফ্লুত অতি উৎসাহি নতুন নতুন সহি আক্বীদার সন্ধান পাওয়া ভায়েরা। মনে রাখবেন! বাংলাদেশের মাটিতে এত সহজে সহি আক্বীদার ভিত্তি স্থাপিত হয়নি? আহলে হাদীসদেরকে এক সময় ওদের মসজিদে নামাজ পড়া তো দূরে থাক, প্রবেশও করতে দেয়া হয়নি, বিয়ে-শাদি দেয়নি, হাজার হাজার বাহাস-মুরাযারা করে শেষ পর্যন্ত কুরআন ও সহী হাদীসের সিপাহ সালারদের নিকট পরাজিত হয়ে আহলে হাদীস ওলাগণের কাছে মাথা নত করেছে। কিন্তু তারপরেও থেমে থাকেনি তাদের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, একেক সময় একেক ভাবে আহলে হাদীসদের মাঝে ফাটল ধরানোর ফাঁদ পেতে থাকে। তারই ধারবাহিকতা স্বরূপ “মাদানী” দেরে আমল-আক্বীদা, বিশেষ করে তাওহীদ ও শিরক-বিদআতের দাওয়াতকে বিনষ্ট করারই এ এক চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু এই অপকৌশল যদি না বুঝতে সক্ষম হোন তাহলে “সহী আক্বীদা পাওয়ার পর আবারও কিন্তু হারাতে হতে পারে। সুতরাং সাবধান!!! আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন।

Comments Us On Facebook: