তাবলিগ জামাতের সচারচর ব্যবহূত কিছু পরিভাষা ও তার অর্থ

তাবলিগ জামাতের বেশ কিছু পরিভাষা আছে যা সচারচর ব্যবহূত হতে দেখা যায়। যেমন- তাবলিগ জামাতের মূলনীতিকে বলে উসূল। এটা ছয় সিফাত বা গুণ নামেও ব্যাপক পরিচিত। এরকম উসূল ছয়টি। কালিমা (ঈমান), নামাজ, রোযা, ইলম ও জিকির, ইকারামুল মুসলিমিন (মুসলমানদের কল্যাণ), সহী নিয়ত ও দাওয়াতে তাবলীগ। আবার উসূল বলতে যারা দ্বীনের মেহনতে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছেন তাদের টাকা-পয়সা ও বিছানাপত্র নিয়ে আসাকেও বোঝায়। প্রথমদিকে মাওলানা ইলয়াস (র.) দিনমজুর, শ্রমিক-কৃষকদের ডেকে এনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দু’বেলা খাবারও দিতেন যাতে তারা দ্বীনী শিক্ষা লাভে উত্সাহিত হয়। পরে নিজ অর্থ ব্যয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করা হয়। সেসময় তার এই কর্মপ্রয়াসকে বলা হতো ইসালে নফস বা আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক পাঠ এবং তাহরিকুস সালাত বা নামাজের আন্দোলন। তাবলীগের আমিরকে বলা হয় হযরতজি। এই জামাতের লোকদের মধ্যে ‘মেহনত’ ও ‘ফায়দা’ শব্দ দুটি বহুল প্রচলিত। এখানে মেহনত অর্থ ধর্ম প্রচারের জন্য পরিশ্রম করা, কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করা। আর ফায়দা অর্থ লাভ। যেমন- প্রতি ওয়াক্তে ফরজ নামাজের পর তাবলীগের একজন কর্মী বলে ওঠেন, ‘ নামাজের পর ইমান ও আমলের ওপর বয়ান হবে। আমরা বসি। বহুত ফায়দা হবে’। ফায়দার পাশাপাশি ফয়েজ-বরকতও বহুল প্রচলিত শব্দ।

তাবলীগের প্রতিটি জামাতে ১৫-২০ জন মুসল্লি থাকেন। তারা বাড়ি বাড়ি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এমনকি পথে-ঘাটে মানুষকে দ্বীন সম্পর্কে নসিহত করেন। এই দলের প্রধানকে বলা হয় ‘রাহবার’। রাহবার মানে পথপ্রদর্শক তথা যিনি পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। আর পাড়া-মহল্লায় এভাবে ধর্মপ্রচারকে বলা হয় ‘গাশত’। গাশত ফারসি শব্দ। এখানে এর মানে ঘোরাফেরা করে দাওয়াত দেওয়া। অন্যদিকে ‘চিল্লা’ শব্দটিও তাবলীগ জামাতের লোকদের মধ্যে অধিক প্রচলিত। চিল্লা অর্থ চল্লিশ তথা ৪০দিনের জন্য ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়া। এর উদ্দেশ্য হল— ১. ঈমান-আমলের উন্নতি, ইলম অর্জন ও আত্মশুদ্ধি ২. প্রতি এলাকা থেকে জামাত বের করে আনা ও ৩. প্রতিটি মসজিদে পাঁচ আমল চালু করা। পাঁচ আমলের (কাজ) মধ্যে আছে- সপ্তাহে দুদিন গাশত করা, প্রতিদিন মাশওয়ারা বা পরামর্শ করা, প্রতিদিন আড়াই ঘন্টা দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া, প্রতিদিন মসজিদ ও বাড়িতে তালিম দেয়া এবং মাসে তিনদিন তাবলীগে যাওয়া। এভাবে দেখা যাচ্ছে তাবলীগের কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে উত্তরোত্তর ধর্মের প্রতি মহব্বত বৃদ্ধি পায়। মানুষ আল্লাহওলা ব্যক্তিতে পরিণত হয়।

তাবলীগ জামাতের লোকজনের মধ্যে ‘তাশকীল’ শব্দটিও ব্যাপক ব্যবহূত। এর মানে দাওয়াতের গুরুত্ব বুঝিয়ে তাবলীগে যাওয়ার জন্য কাউকে তৈরি করা। ‘মুজাকারা’ মানে কোন বিষয়ে সকলে মিলে আলোচনা করা। বিশ্ব ইজতেমায় যে ‘খিত্তা’ শব্দটি ব্যবহূত হয়, এর অর্থ অঞ্চল আর ‘হালকা’ মানে এলাকা। একই অর্থবোধক হলেও আসলে হালকা খিত্তার চেয়ে ছোট। মসজিদে মসজিদে তাবলীগের যে জামাত যায় এবং এই জামাতের যিনি নেতৃত্ব দেন তাকে বলা হয় জিম্মাদার বা আমির। আর যারা তার অধীনে থাকেন তাদের বলা হয় মামুর বা সাথী। মামুর মানে যিনি বা যারা নির্দেশ মেনে চলে চলেন। গাশত চলাকালীন যিনি পথ দেখান তাকে রাহবার বলা হয়, এই কথা আগেই বলা হয়েছে। তবে যিনি দাওয়াত দেন তাকে বলা হয় ‘মুতাকাল্লিম’। মুতাকাল্লিম আরবি শব্দ। অর্থ যিনি কথা-বার্তা বলেন বা ভাষণ দেন। কোন এলাকার মসজিদে যাওয়ার পর সকলের সাথে পরিচিত হওয়ার নিয়ম আছে। এটাকে বলা হয় তারুফ বা পরিচিতি। আবার সর্বসাধারণের জন্য যে আলোচনা হয়, তাকে বলে আম বয়ান। আর আলেম-ওলামা, বিভিন্ন চাকরিজীবী, ছাত্র প্রভৃতি শ্রেণী ও পেশার মানুষের জন্য আছে আলাদা আলাদা বয়ানের নিয়ম। একে বলা হয় খাস বা খাওয়াস বয়ান। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা মুতাকাল্লিমের দায়িত্ব পালন করেন।

Comments Us On Facebook: