Monday , July 16 2018
Home / আলোচিত সংবাদ / জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৬ সাক্ষীর শাস্তি চেয়ে খালেদা জিয়ার আবেদন

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৬ সাক্ষীর শাস্তি চেয়ে খালেদা জিয়ার আবেদন

মিথ্যা অভিযোগ, মিথ্যা সাক্ষ্য ও মিথ্যা দলিল তৈরি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে -খালেদা জিয়ার আইনজীবী জাল-জালিয়াতি করে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার নথিপত্র সৃষ্টি, মিথ্যা অভিযোগে মামলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার অভিযোগ এনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর-রশীদসহ ছয় সাক্ষীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করেছেন খালেদা জিয়া। তার পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী বুধবার রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামানের আদালতে এ আবেদন দাখিল করেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৭৬ ও ১৯৫(১)(বি)(সি) ধারার আলোকে দণ্ডবিধির ১৯৩/১৯৫/১৯৬/৪৬৬/৪৬৯/৪৭১ ও ১০৯ ধারায় যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়। তদন্ত কর্মকর্তা ছাড়াও যাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করা হয়েছে তারা হলেন- মামলার চার্জশিটভুক্ত সাক্ষী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হিসাব বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মাজেদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর সাবেক পিএস সৈয়দ জগলুল পাশা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক তৌহিদুর রহমান খান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হিসাব বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল মজুমদার ও আবদুল বারেক ভূঁইয়া।

আদালত খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দেয়া আবেদনটি গ্রহণ করলেও এ নিয়ে কোনো আদেশ দেননি। এদিন খালেদা জিয়ার পক্ষে অষ্টম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। তবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ না হলে আদালত বৃহস্পতিবার (আজ) পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেন। ওই দিন একই আদালতে জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

দুই মামলায় হাজিরা দিতে বেলা ১১টা ৫৩ মিনিটের দিকে আদালতে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। এরপর দুপুর ১২টার দিকে বিচারক এজলাসে প্রবেশ করলে অনুমতি নিয়ে তিনি নির্ধারিত আসন (একটি চেয়ার ও একটি টেবিল) গ্রহণ করেন। শুরুতেই বিচারক বলেন, একটি কথা আমি সবার আগে বলতে চাই- আমাদের কোর্ট টাইম সকাল সাড়ে ৯টায়। দুপুর ১২টায় কোর্ট চলতে পারে না। এখন ১২টা বাজে, এভাবে সময় নষ্ট করে কোর্ট কিভাবে চলবে? আমরা (বিচারক) আপনাদের (খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের) সম্মান করি বলে এভাবে যদি প্রতিদিনই দেরি করতেই থাকেন, তাহলে কোর্ট কিভাবে চলবে? বাংলাদেশের সবচেয়ে সেরা ল’ইয়াররা এখানে আছেন। আপনারা কি টাইম-টেবিল মেনটেইন করবেন না! আপনি (আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী) ১০টায় আসছেন, আমিও (বিচারক) ১০টায় এসেছি। তাহলে আমরা কিভাবে এলাম? আমি আগামীকাল থেকে সাড়ে ১০টায় বসব। আপনারা থাকুন আর নাই থাকুন, আমি আমার মতো করে কোর্ট চালাব। এভাবে চলতে পারে না। আপনারা যখন আসেন তখনই এজলাসে উঠি।

এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আপনাদের বক্তব্য আমি শুনব, ঠাণ্ডা মাথায় বলেন। এরপর আইনজীবীরা আদালতে হইচই করলে বিচারক বলেন, আপনারা এভাবে করতে থাকলে আমি আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করে চলে যাব। এরপর সিনিয়র আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান আদালতকে বলেন, তিনটি কথার ওপর এ মামলা। প্রথম কথা- ম্যাডাম জিয়া (খালেদা জিয়া) অ্যাকাউন্ট খোলেন, দ্বিতীয় কথা- ম্যাডাম জিয়া টাকা উত্তোলন করেন, তৃতীয় কথা- ম্যাডাম জিয়া ডিস্ট্রিবিউশন করেন। আর অতিরিক্ত একটা কথা- তিনি ট্রাস্ট গঠন করেন। এ চার কথার ওপর করা মামলায় কেন আমাদের এতদিন বলতে হচ্ছে? আমরা বলেছি, সব কিছুই জাল-জালিয়াতি করে করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, মামলার প্রাসঙ্গিক বিষয়ে যুক্তিতর্ক তুলে ধরতে। যতক্ষণ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ না হয়, ততক্ষণ অনুগ্রহ করে আমাদের কথা শুনবেন। এরপর পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এদিকে খালেদা জিয়ার পক্ষে অষ্টম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে তিনি বলেন, দুদক কর্মকর্তা নূর আহমেদ ২০০৮ সালের ১১ জুন ‘অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের সংশ্লিষ্ট নথি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংবলিত কাগজপত্র সরবরাহ না করায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে মতামত প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।’ মর্মে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। আর এ প্রতিবেদন দাখিলের মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে (ওই বছরের ২৫ জুন) অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ কোনো প্রকার সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য, সৃজনকৃত কাগজপত্র ও সাক্ষীদের নামে সাজানো এবং মিথ্যা বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেন। তিনি ওই প্রতিবেদনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ লাইনটি সংযুক্ত করেন- ‘অনুসন্ধানে তৎকালীন মুখ্য সচিবের পিএস সৈয়দ জগলুল পাশা ওই নথিপত্র উপস্থাপন ও সংরক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন।’ হারুন-অর-রশীদ অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা, আবার তিনিই এ মামলার তদন্ত করে অন্যায়ভাবে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযাগে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। তিনি আরও বলেন, সবার আগে এ মামলায় টাকার উৎস নির্ণয় করা জরুরি। বাংলাদেশে কুয়েত দূতাবাস থেকে যে পত্র দেয়া হয়েছে, তাতে কুয়েতের আমীর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে টাকাটা দিয়েছেন মর্মে বলা আছে।

এজে মোহাম্মদ আলী এ পর্যায়ে অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর রশীদসহ ৬ সাক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ১২ পৃষ্ঠার একটি লিখিত আবেদন করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে তিনি খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতিরও নিবেদন জানান। তিনি বলেন, জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জিয়া অরফানেজ মামলাটি সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামীয় কোনো তহবিল খালেদা জিয়া খোলেননি। এ সময় তিনি কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন।

দুপুর ১টা ২৫ মিনিটের দিকে আদালত বিরতি দেন। বিরতি শেষে দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন অপর আইনজীবী ব্যারিস্টার জরিমউদ্দিন সরকার। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় তিনি আদালতে বলেন, প্রসিকিউশনের দায়িত্ব হল সন্দেহাতীতভাবে আসামির অভিযোগ প্রমাণিত করা। এক্ষেত্রে প্রসিকিউশন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। হিসাব খোলার ফর্মে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর নেই। তিনি ওই অ্যাকাউন্ট খোলার নির্দেশও দেননি।

তিনি ব্যক্তিগত কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কখনও ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। যদি ক্ষমতার অপব্যবহারের এক তিল পরিমাণ তথ্য-প্রমাণ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুসারে আদালত যে শাস্তি দেবেন তা মাথা পেতে নেব। তিনি বলেন, ১৪ নম্বর সাক্ষী সৈয়দ জগলুল পাশা- তিনি কি মারা যাচ্ছেন? নাকি এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে? নাকি তিনি পাগল হয়ে যেতে পারেন এমন আশঙ্কা রয়েছে?
যদি এ তিন কারণের কোনোটিই না হয় তাহলে কেন সৈয়দ জগলুল পাশাকে দিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি করানো হল। প্রথম অনুসন্ধানে যেখানে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো তথ্য-প্রমাণই পাওয়া যায়নি, সেখানে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হল। নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন সাজা না পান সে বিষয়ে আদালতের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ করেন তিনি।

এরপর এদিনের মতো ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের যুক্তিতর্ক কার্যক্রম শেষ হলে আদালত বৃহস্পতিবার (আজ) পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।আদালতের বাইরে এসে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ২০০৬ সালে যখন ইমার্জেন্সি হল, তখন মইন উ আহমেদ আর্মির চিফ ছিলেন। সে সময় খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার জন্য জেলে নেয়া হল। এর পর যখন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কিছুই পাচ্ছিল না, তখন উনাকে ও উনার দলকে দুর্বল করার জন্য এ মামলা করা হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন আবদুর রেজ্জাক খান। তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর খন্দকার মাহবুব হোসেন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। এদিন এজে মোহাম্মদ আলী তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। অপর আইনজীবী জমিরউদ্দিন সরকার তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন অব্যাহত রেখেছেন। এরও আগে ১৯ ডিসেম্বর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ সব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মর্মে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে দুদক প্রসিকিউশন।

বরাবরের মতো খালেদা জিয়ার হাজিরা উপলক্ষে বুধবারও আদালতে চত্বরে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়। এদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আবদুল আউয়াল মিন্টু, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, রুহুল কবির রিজভী, মির্জা আব্বাস, আফরোজা আব্বাস প্রমুখ। এছাড়া খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, মো. মাসুদ আহমেদ তালুকদারসহ শতাধিক আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রাজধানীর রমনা থানায় প্রথম মামলাটি করা হয়। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় দ্বিতীয় মামলাটিও করে দুদক।

About banglamail71

Check Also

এমন একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ।

এমন একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজদ্দৌলার …