স্বাধীন বাংলার শ্রেষ্ঠ ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির -এম এস চৌধুরী

১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে এ দেশ ছিল পাকিস্তানিদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তখন বাংলার মানুষ ছিল তাদের মৌলিক প্রাপ্য অধিকারসমূহসহ সকল অধিকার বঞ্চিত। তাই এসব অধিকার আদায়ে বাঙালী নেমেছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে। এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় আসে মুক্তিকামী বাঙালীর। কিন্তু বাঙালী নামে স্বাধীন হলেও এখনো পুরোপুরি স্বাধীনতা ঘরে আনতে পারেনি। ১৯৭১সালে যেসব মৌলিক চাহিদা আদায়ে বাঙালী যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছিল তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। বরং এ যুদ্ধে সহযোগিতা নামে বাঙালীর অর্জিত অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে ভারত তারা আজও লুন্ঠন করছে আমাদের সম্পদ। অথচ স্বাধীনতার ৪৫বছরে এসে আজও নিজের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটিও বুঝে পায়নি স্বাধীনতাকামী বাঙালী।

বাঙলার মানুষ যখন স্বাধীনতার পরও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ তাদের মৌলিক অধিকারসমূহ বঞ্চিত হচ্ছিল ঠিক তখন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে একদল সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তারা বুঝতে পারে বার বার পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ এ জাতিকে মুক্ত করতে হলে একদল সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। যারা সততা, আদর্শ ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে এ দেশকে সমৃদ্ধশালী একটি দেশ হিসেবে গডতে পারবে। যারা নিজেদের দেশ, মা ও মাটিকে পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়ে হলেও পাকিস্তান, ভারত কিংবা অন্য কোন অপশক্তির কাছে বিক্রি করে দিবে না।

সুদৃড় এই লক্ষ্য বুকে নিয়ে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের জন্য ভূমিকা রাখতে শুরু করে সংগঠনটি। কিন্তু সত্যের পথচলা কখনো সহজ হয় না। তোমনি ছাত্রশিবিরের পথচলাও সহজ হয়নি। দেশে প্রেম বুকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিগত ৩৯বছরে শিবিরকে সহ্য করতে হয়েছে নানা অপবাদ ও নির্যাতন। দেশের সার্থে কাজ করতে গিয়ে ভিনদেশী দালালদের দ্বারা বার বার সহ্য করতে হয়েছে নানা বঞ্চনা। তবু ছাত্রশিবির পিছু হটেনি। আজও ছালিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের প্রচেষ্টা। শত বাধা সত্তেও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে ছাত্রশিবির নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে, যা দেশে ও দেশের বাইরের অসংখ্য মানুষের সুনাম অর্জন করেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্রশিবিরের অবদান

স্বাধীন বাংলাদেশে একমাত্র দেশ প্রেমিক ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির। কেননা অন্য ছাত্র সংগঠনগুলো যখন চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজীসহ ব্যক্তির উন্নয়নে নানা চল ছাতুরিতে ব্যাস্ত ঠিক তখন মেধা ভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে দেশ প্রেমিক নেতৃত্ব তৈরিতে ব্যাস্ত শিবির। কখনো টেন্ডর নিয়ে রাজনীতি করবে না এমন একদল নেতা তৈরিসহ স্বাধীন বাংলাদেশে নানা ভুমিকা রেখে আসছে শিবির। তার কিছু তুলে ধরা হল-

স্বাধীন দেশের নেতৃত্ব তৈরিতে ভূমিকা:

• দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব তৈরি: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির তাদের কর্মীবাহিনীকে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতে এবং দেশ প্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে সমসাময়িক নানা কর্মসূচি গ্রহন ও ব্যাপক অধ্যয়নেরব্যবস্থা করেছে।

এছাড়া সংগঠনের ভিশনও তৈরি করা হয়েছে দেশ প্রেমের ভিত্তিতে। ফলে শুরু থেকেই শিবিরের কর্মীবাহিনী দেশপ্রেম বুকে নিয়েই গড়ে উঠছে।

• মেধা ও নৈতিকতার সমহ্নয়ের শিক্ষা: নৈতিকতাহীন মেধা কখনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। কেননা একজন অশিক্ষিত লোক তার হাত দ্বারা দেশের যতটা ক্ষতি করতে পারে, কলম দিয়ে তার অন্তত ১০গুন বেশি করতে পারে একজন শিক্ষিত লোক। তাই ছাত্রশিবির একজন মেধাবী ছাত্রকে মেধার সাথে নৈতিকতার সমহ্নয়ের শিক্ষা দেয়। সেজন্য সংগঠনটি একটি সু-নিদৃষ্ঠ সিলেবাসের মাধ্যমে তাদের কর্মীবাহিনীর অধ্যয়নের ব্যবস্থা করেছে। যার মাধ্যমে তারা অর্জন করছে নৈতিকতার শিক্ষা।

• জ্ঞান নির্ভর সংগঠন ও গতিশীল নেতৃত্ব: ছাত্রশিবির বাংলাদেশের একমাত্র ছাত্র সংগঠন যারা জ্ঞানের ভিত্তিতে ছাত্রদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচনকরে। এখানে কোন অছাত্রের স্থান হয় না।

শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা:

• শিক্ষা সহায়তা: দেশের শিক্ষা বিস্তারে ছাত্রশিবির বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিবির গরিব ছাত্রদের সহযোগিতায় ছাত্রকল্যাণ তহবিল গঠন, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, স্টাইপেন্ড, লজিং- টিউশনির ব্যবস্থা, কোচিং, ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার গাইডলাইনসহ নানা কর্মসূচি গ্রহন করে।

এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ন্যার্য অধিকার নিশ্চিতে ও ছাত্র সমস্যা সমাধানের আন্দোলনে সব সময় ছাত্রশিবির নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

• মেধাবীদের মূল্যায়ণ: ছাত্রশিবিরের সবচেয়ে বড় গুন তারা মেধাবীদের মূল্যায়ণ করে। ছাত্রশিবির বিশ্বাস করে মেধাবীদের দিয়েই সমৃদ্ধ দেশ গঠন সম্ভব। তাই তারা মেধাবীদের উৎসাহ দিতে প্রতিবছর সংবর্ধনা, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, গরিব মেধাবীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান, কোচিং, শিক্ষামূলক সভা বা সেমিনার আয়োজন, ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রামসহ নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে।

• কৃতি ছাত্র সংবর্ধনা: ছাত্রশিবির তরুণ মেধাবীদের মেধাকে দেশের জন্য বিনিয়োগ করতে শেখায়। এজন্য তারা বিভিন্ন পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা অর্থাৎ সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি বছর সংবর্ধনা দিয়ে আসছে। সেই সংবর্ধনা থেকে ছাত্রশিবির তরুণ ছাত্র সমাজকে তাদের মেধা দেশপ্রেমে বিনিয়োগ করতে আহবান জানায়।

• প্রযুক্তিবীদ তৈরি: ছাত্রশিবির বিস্বাস করে দেশের ভেতর থেকে যথাযথ প্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ লোকবল তৈরি করতে পরলে নিজ দেশের সম্পদ ব্যবহারে আমাদের অন্য দেশের দিকে চেয় থাকতে হবে না। আর আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সমূহের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেও খুব সহজে দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধশালী করা সম্ভব। তাই শিবির মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ হতে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে উৎসাহ দিয়ে আসছে।

• চিকিৎসক তৈরি: মানুষের মৈলিক অধিকার সমূহের অন্যতম প্রধান একটি হল চিকিৎসা। তাই ছাত্রশিবির মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের সার্থে একদল দেশপ্রেমিক চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্যে মেডিকেলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের নানা দিক থেকে সহায়তা ও উৎসাহ দিয়ে আসছে।

• প্রতিভার লালন ও বিকাশ: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কেবল প্রতিভা বিকাশ ও লালনের কাজই করে না বরং শিবির হচ্ছে প্রতিভা সন্ধানী একটি অনন্য সংগঠন। ছাত্রদের সুপ্ত প্রতিভা সন্ধানের জন্য শিবির প্রতি বছর তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিভিন্ন কুইজ প্রতিযোগিতা, মেধা যাচাই, ক্যারিয়ার গাইডলাইন কনফারেন্স, কম্পিউটার মেলা, বিজ্ঞান মেলা, সাধারণ জ্ঞানের আসর, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, ক্রিকেট ও ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
এছাড়া শিবির আয়োজন করে থাকে আন্তঃস্কুল, আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতা। এসব আয়োজন যেমনভাবে উদ্বুদ্ধ করে মেধাবী তরুণদের, তেমনিভাবে বের করে আনে প্রতিভাসমূহকে, যারা গড়ে তুলবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

• স্বাক্ষরতা অভিযান: স্বাক্ষরতা একটি জাতির মৌলিক অধিকার। তাই নিরক্ষরদের স্বাক্ষরতার জ্ঞান দিতে ছাত্রশিবির প্রতি বছর স্বাক্ষরতা অভিযান পরিচালনা করে আসছে।

মুক্তিযোদ্ধ‍াদের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন:

• মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বুকে ধারণ: বাংলাদেশ সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা এক স্বপ্নের দেশ। এই দেশকে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল মুক্তিযোদ্ধারা। তাই ছাত্রশিবির সব সময় মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শকে অনুসরণ ও মূল্যায়ণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা আজও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বুকে নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। দেশ বিরোধী ষড়জন্ত্র রুখে দিচ্ছে।

• মুক্তিযোদ্ধ‍াদের যথাযথ মূল্যায়ন: স্বাধীন দেশ নিয়ে আমরা গর্ব করছি। অথচ এদশের মুক্তিযুদ্ধে যারা নিজের জীবন যৌবন সব দিয়েছিল তাদের মূল্যায়ন করছি না। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বুকে ধারণ করে শিবির তাদের যথাযথ মূল্যায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা প্রতিবছর মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের সংবর্ধনা, বৃত্তি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে।

• মুক্তিযুদ্ধের প্রচার ও প্রসার: বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের প্রচার ও প্রসারে শিবির জাতীয় দিবস সমূহে দুস্থদের খাবার বিতরণ, শোভাযাত্রা, জাতীয় পাতাকা বিতরণ, সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, মুক্তিযুদ্ধের চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।

দেশের দুর্যোগ দুর্ভোগে শিবির : বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগ কবলিত জনপদ। ইতিহাসের ভয়াবহ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করে টিকে আছে এদেশের মানুষ। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির জাতির এসব ক্রান্তিকালে রেখেছে সাহসী ও উদার ভূমিকা। এগিয়ে এসেছিল দুর্যোগ কবলিতদের পাশে।

বৃক্ষ রোপন: বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগ কবলিত জনপদ। এ দেশ ও বিশ্বকে দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে বৃক্ষ রোপনের বিকল্প নেই। তাই শিবির প্রতিবছর বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি পালন ও বৃক্ষ রোপনে উৎসাহ দিতে শোভাযাত্র‍া ও বৃক্ষ বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।

দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া: একটি ছাত্রসংগঠন হিসেবে জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যু ও ক্রান্তিলগ্নে এ সংগঠন রেখে এসেছে ইতিবাচক ভূমিকা। যখনই দেশ বিরোধী কোন সড়যন্ত্র হয়েছে, ছাত্রশিবির ঠিক তখনই সেই সড়জন্ত্র রুখে দিতে এগিয়ে এসেছে। দেশ বিরোধী নানা সড়যন্ত্রের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছাত্রশিবিরকে হারাতে হয়েছে অসংখ্য সহপাঠীকে।

সব দিক বিবেচনায় এ কথা অকপটে বলা যায় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক ছাত্র সংগঠনের বিবেচনায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরই সবার সেরা।

Comments Us On Facebook: