চেচনিয়াকে যেভাবে বদলে দিচ্ছেন চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ

রাশিয়ান প্রজাতন্ত্র তাতারস্থান একদা ইউরোপের সর্ববৃহৎ মসজিদ নির্মাণ করে তার নিজেকে গর্বিত করেছে। দামি সব পাথর ও মার্বেল নির্মিত ‘কুল শরীফ’ মসজিদটি ২০০৫ সালে তাতারস্থানের আঞ্চলিক রাজধানী কাজানে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়।

অনেক আগে থেকেই রাশিয়ার শক্তিশালী আঞ্চলিক মুসলিম নেতারা তাতারস্থানকে শাসন করতেন এবং এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত একমাত্র ‘ইসলাম ভিত্তিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র’ উত্সব।

কিন্তু চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে রমজান কাদিরভের আবির্ভাবে তাতারস্থানের এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। ২০০৭ সালে ক্রেমলিন কর্তৃক তার নিয়োগের পর থেকে কাদিরভ চেচনিয়াকে রাশিয়ার একটি গতিশীল মুসলিম অঞ্চল হিসাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন।

রাশিয়ান বিশ্লেষক নিকোলাই পেট্রোভ বলেন, ‘বর্তমানে চেচনিয়া তার নিজের অবস্থানকে কেবল রাশিয়ার স্বশাসিত অংশ হিসেবেই নয়, বরং মুসলিম কেন্দ্র হিসেবেও সক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।’

কাদিরভ ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজ্যটিতে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। দুটি ভয়াবহ যুদ্ধের পর তাতারস্থানের ব্যাপক পুনর্গঠন অভিযানে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব তাকে এই জনপ্রিয়তা অর্জনে সহায়তা করেছে।

মন্তব্যকারীরা বলছেন যে তাতার নেতা মিন্টিমার শাইমিয়েভের রাজনৈতিক অবসর গ্রহণে তাতারস্থানের আধিপত্যকে ভূপাতিত করার কাদিরভের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উৎসাহিত করেছে।

প্রায় দুই দশক ধরে তাতারস্থানকে শাসন করার পর তাতার প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ান মিন্টিমার শাইমিয়েভ। তিনি তার বিশ্বস্ত সহযোগী রুস্তম মিন্নিখানোভের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। যদিও মিন্নিখানোভ তার পূর্বসূরীর মতো দক্ষতা দেখাতে পারেননি।

সেন্ট পিটার্সবার্গের ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক ভ্লাদিমির গেলম্যান বলেন, ‘শাইমিয়েভ সফলভাবে মস্কোর সঙ্গে দরকষাকষি করতে সক্ষম ছিলেন, কিন্তু মিন্নিখানোভের সম্ভাব্যতা অনেক বেশি সীমিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘আশীর্বাদপূর্ণ একটি স্থান কখনো খালি থাকে না। কাদিরভ এই পরিস্থিতি থেকে উপকার লাভের সুযোগ খুঁজে পান। তিনি অনেক বেশি উদ্যমী, আবেগপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং তিনি তার নিজস্ব উপায়ে সম্পদ ব্যবহারের চেষ্টা করছেন।’

মস্কোর অনুগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতা
কাদিরভ ঘোষণা দেন যে, তার স্বপ্ন হচ্ছে চেচনিয়াতে বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদ নির্মাণ করা। যদিও রাজ্যের রাজধানী গ্রোজনিতে ইতোমধ্যে অন্যতম বৃহৎ সেন্ট্রাল ডোম মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে।

গ্রোজনি সেন্ট্রাল ডোম মসজিদটি ২০০৮ সালের অক্টোবরে জনগণের প্রার্থনার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এখানে একই সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। ২০০৫ সালে নির্মিত ‘কুল-শরিফ’ মসজিদটির স্থান দখল করে নিয়েছে এটি। বর্তমানে এটি ইউরোপের সর্ববৃহৎ মসজিদ হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। মসজিদটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন উপস্থিত ছিলেন।

২০ কোটি ডলারের বিলাসবহুল মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে কাদিরওভের প্রয়াত বাবা সাবেক চেচেন প্রেসিডেন্ট আহমেদ হাজি কাদিরভের নামে। ২০০৪ সালে বোমা হামলার ঘটনায় তিনি নিহত হন।

এছাড়াও, গ্রোজনিকে রাশিয়ার মুসলিম চলচ্চিত্রের ‘গোল্ডেন মিনবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র’ উৎসবের একটি নতুন ভেন্যু হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ২০০৫ সাল থেকে কাজানে এই উত্সবটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে, মস্কোর পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এই উৎসবটি বর্তমানে কাজান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধের কারণে বিকল্প হোস্ট শহরের সন্ধান করা হচ্ছে।

তবে, রাশিয়ার অন্য শহরগুলোর ‘গোল্ডেন মিনবারের হোস্টিংয়ের’ প্রত্যাশা আপাতত পূরণ হচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে। তাতারস্থান এই উৎসবের নিজস্ব সংস্করণ উন্মোচিত করেছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর এর নতুন নামকরন করা হয়েছে ‘কাজান ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভাল অফ মুসলিম ফিল্ম’।

ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্য সহনশীলতা অর্জনের লক্ষ্যে গ্রোজনি ইতোমধ্যে ‘নোহ আর্ক’ নামে একটি বার্ষিক আন্তর্জাতিক ফিল্ম উৎসব চালু করেছে। ২০০৮ সাল থেকে এই উৎসবের আয়োজন করে আসছে গ্রোজনি।

কাদিরভ একাধিকবার তার নিজেকে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসাবে নিজেকে বর্ণনা করেছেন এবং চেচনিয়ায় কঠোর ইসলামি অনুশাসন জোরদার করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। রাজনৈতিক ও আর্থিক লাভের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে যদিও অনেকে এই চেচেন নেতা অভিযুক্ত করে থাকেন।

গেলম্যান বলেন, ‘আজকে ধর্ম একটি শক্তিশালী বিপণন পণ্যে পরিণত হয়েছে। ১৯৯০ এর দশনে এটি ছিল জাতিগত সমস্যা। মিন্টিমার শাইমিয়েভ এই ব্ল্যাকমেইল টুলটিকে খুব কার্যকরীভাবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি ক্রমাগতভাবে মস্কো থেকে ছাড় পেয়ে আসছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে তাতার জনগোষ্ঠী মস্কো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন তাতারস্থান নির্মাণ করবে।’

যুদ্ধ-ক্ষেত্র ককেশাস প্রজাতন্ত্র তাতারস্থানের জনসংখ্যা ও আকার অনেক কম। এছাড়াও ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলসিন কর্তৃক স্বাক্ষরিত ক্ষমতার অংশীদারিত্ব চুক্তির কারণে এটি ব্যাপক তেল সম্পদ, শত শত বছরের প্রাচীন মুসলিম ঐতিহ্য এবং মস্কো থেকে অপেক্ষাকৃত উচ্চ স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করে থাকে।

যাইহোক, চেচনিয়া প্রজাতন্ত্রকে একটি নতুন মুসলিম কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠায় কাদিরভ প্রচেষ্টাকে নিরবে দেখতে হচ্ছে কাজানকে।

গত জুন মাসে রাশিয়ায় ইসলাম গ্রহণ স্মরণে একটি উদ্যোগে চেচনিয়া ও অন্যান্য উত্তর ককেসাস প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে তাতার ধর্মীয় নেতারা বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। উভয় পক্ষই ইসলাম নিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে।

তাতারস্তানের ডেপুটি মুফতি ভ্যালিলা ইয়াকুব স্পষ্ট করেছেন যে তার প্রজাতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো প্রচেষ্টাকে তারা সহ্য করবেন না।

তিনি বলেন, ‘তাতার জনগোষ্ঠী রাশিয়ায় বৃহত্তম মুসলিম সম্প্রদায়। আমরা অন্যদের চেয়ে রাশিয়ার বৃহত্তম অংশ।’

রেডিও ফ্রি ইউরোপ রেডিও লিবার্টি অবলম্বনে

Comments Us On Facebook: