Thursday , October 18 2018
Home / পাঠক কলাম / কেমন ছিলো ইতিহাসের কলঙ্কিত সেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ? ( ছবি ও ভিডিও)

কেমন ছিলো ইতিহাসের কলঙ্কিত সেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ? ( ছবি ও ভিডিও)

বাংলাদেশের ইতিহাসের কলঙ্কিত সেই ৫ জানুয়ারি  ,গণতন্ত্র হত্যা দিবস। ২০১৪ সালের এইদিনে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি অবাধ, গ্রহণযোগ্য ইনকুসিভ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক সব মহলের দাবি উপেক্ষা করে প্রতিবেশী একটি দেশের তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জোরে একটি ভোটার এবং প্রার্থীবিহীন নির্বাচনি প্রহসন করে ক্ষমতাকে আঁকড়ে রাখে বর্তমান সরকার। বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর ইতিহাসে এটিকে কলঙ্কিত নির্বাচন হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। ভোটারবিহীন কলঙ্কিত ৫ জানুয়ারির চার বছর পূর্ণ হলো আজ। এরপর থেকেই বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন জোট ছাড়া বিরোধী সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ করার মতোই। বিএনপিসহ বিরোধী দলের মাঠে-ময়দানে সভা-সমাবেশের কোনো অনুমতি দিচ্ছে না পুলিশ। দেশজুড়ে চলছে যৌথবাহিনীর গ্রেফতার বাণিজ্য, হত্যা, গুম ও নির্যাতন। ৫ জানুয়ারির ধারাবাহিকতায় দেশে চলছে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন। কলঙ্কিত ৫ জানুয়ারিকে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবেই পালন করবে।

এ উপলক্ষে বিএনপির উদ্যোগে সারাদেশে কালো পতাকা মিছিল ও কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচি পালন করছে। ৭ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির পক্ষ থেকে জনসভার অনুমতি চাওয়া হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো অনুমতি দেয়া হয়নি। অন্যান্য সব রাজনৈতিক দলই দিনটি পালন করবে কালো দিবস হিসেবে। ৫ জানুয়ারির গণতন্ত্র হত্যা বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ২০১৫ সালে বিএনপি ঢাকায় সমাবেশ আহবান করলেও পুলিশ বিএনপি চেয়ারপারসনকে গুলশানের বাসায় বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। টানা ৯২ দিন অবরুদ্ধ করে রাখায় দেশনেত্রী জনসভায় যোগদান করতে পারেননি। ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। সারাদেশে শুরু হয় টানা অবরোধের আন্দোলন। : ৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত ওই নির্বাচন শুধু ভোটারবিহীন নয়, প্রার্থীবিহীনও ছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টি ছাড়া বেশির ভাগ দলই নির্বাচন বর্জন করে। এমনকি ১৪ দলের সাম্যবাদী দল, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টিসহ বামপন্থী দলগুলোও নির্বাচন বর্জন করে প্রহসন প্রতিরোধে জনতার সাথে অংশ নেয়। জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে রাজি করাতে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ভারতীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে চেয়ারম্যান এরশাদের সাথে বৈঠক করে চাপ প্রয়োগ করেন।

গণমাধ্যমে ভারতীয় কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগের বিষয়টি এরশাদ তুলে ধরায় বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপরই নির্বাচনে যেতে বাধ্য করতে পার্টি চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ও তার মহাসচিব সরকারের মন্ত্রী অবস্থায় রুহুল আমীন হাওলাদারকে বাসা থেকে র‌্যাব আটক করে নিয়ে যায়। মুচলেখা রেখে ছেড়ে দেয়া হয় মন্ত্রী রুহুল আমীন হাওলাদারকে। নির্বাচন পর্যন্ত সিএমএইচে চিকিৎসার নামে বন্দি থাকেন এরশাদ। : রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা বর্জন করায় নির্বাচনের আগেই ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় আওয়ামী লীগের কোনো ভোট ছাড়াই সরকার গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, প্রধান বিচারপতিসহ কোনো ভিআইপি কাউকে ভোট দিতে টেলিভিশনেও দেখা যায়নি। কারণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী নেতাসহ ১৫৪ জন এমপিকে নির্বাচিত দেখানো হয়। ভোটারের পাশাপাশি প্রার্থীরাও বর্জন করায় তিন শ আসনের মধ্যে ১৫৪ জন আসনের ক্ষমতাসীন প্রার্থীরা ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হওয়ায় সরকার গঠনের জন্য ১৫১ জনের বেশি হওয়ায় নির্বাচনের কোনো প্রয়োজনই হয়নি।

জঘন্য প্রহসনের ওই নির্বাচনে কত ভোটার ভোট দিয়েছে, তার হিসাব দিতে নজিরবিহীন কালপেণ করে রকিব উদ্দীনের নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের দুদিন পর নির্বাচন কমিশন ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে দাবি করে। তবে সরকারের সাজানো নির্বাচন সম্পর্কে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা জানায়, নির্বাচনে ১৫ থেকে ২০ ভাগের বেশি ভোট পড়েনি। অন্যদিকে বিএনপি দাবি করে, নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে মাত্র। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সব পর্যবেক্ষক সংস্থা বর্জন করায় এমন একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থাও বিস্ময় প্রকাশ করে। দেশের জনগণ ও বিশ্বজনমতকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সর্বোচ্চ পৈশাচিকতা ব্যবহার করে শেখ হাসিনা প্রহসনের নির্বাচনের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও বিরোধী জোটের ভোট বর্জনের আহবানে সাড়া দিয়ে ভোট বর্জনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ।

সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে দেখা গেছে, সারাদেশে কমপে ৪৪টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়ার পরও একটি ভোটও পড়েনি। অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের লাইন তো দূরের কথা টিভি ফুটেজে কুকুর, গরু, ছাগল চড়াতে দেখা যায়। সারাদিনে ৪ থেকে ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন মিডিয়াকর্মীসহ পর্যবেকরা। গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর কেন্দ্র সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার একটি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। ব্যালট বাক্স পুরোটাই খালি। কেন্দ্রটির নাম রামধানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা বজলুর রহমান বলেন, সারাদিন একটি ভোটও কেউ দিতে আসেননি।

 

দুই প্রার্থী থাকলেও তাদের কোনো এজেন্ট সেখানে দায়িত্ব পালন করতে আসেননি। ফলে শুধু ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্যরা কেন্দ্রে ছিলেন। এই কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২০০০। এ ধরনের ৪৪টি কেন্দ্রে কোনো ভোটার তো দূরের কথা আওয়ামী লীগ নেতারাও যাননি। ওই নির্বাচনি প্রহসনে সারাদেশে নির্বাচনি সহিংসতায় নিহত হয়েছে ১৮ জন। ভোটের আগে ও ভোট গ্রহণের সময় বিুব্ধ জনতা আড়াই শর বেশি ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দিয়েছে। জনতার প্রতিরোধে ৫১২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের কেন্দ্র দখলের প্রতিবাদে ভোট বর্জন করেছেন প্রায় অর্ধশত প্রার্থী। খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই ভোটকেন্দ্র দখলের অভিযোগ করেছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী। জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ ওই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো বাতিল করায় মাত্র ৪ জন বিদেশি পর্যবেক ছিলেন। এদের মধ্যে দুজন ভারতের আর দুজন ভুটানের। তারাও বা কোথায় ভোট পর্যবেণ করেছেন সেটিও জানা যায়নি। ৫ জানুয়ারির পরপরই প্রহসনের ওই নির্বাচনের নানা হাস্যকর ও লজ্জাজনক চিত্র ক্রমেই ফুটে উঠছে।

দিনভর ভোটশূন্য থাকলে পরদিন ভোট দেখানো হয়  সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণের শুরুর পর থেকে প্রায় সবক’টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ভোটের সর্বশেষ পরিস্থিতি ভোটার উপস্থিতির সরেজমিন এবং সরাসরি সংবাদ প্রচার করে। এসব সংবাদ থেকে সারাদেশের মানুষ ভোট বর্জনের চিত্র পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। শুধু বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের কর্মীই নয় খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরাও ভোট দিতে যাননি। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ঢাকা-৬ আসনের একটি কেন্দ্র সরকারি কবি নজরুল কলেজ কেন্দ্রের চিত্র তুলে ধরে আরটিভি। ওই কেন্দ্রের তিনটি ভোটকে ২ ঘন্টা ১০ মিনিটে ভোট পড়েছে মাত্র ৭টি। সকাল ৯টায় চট্টগ্রামের জামাল খান হাইস্কুল কেন্দ্রের ভোটকেন্দ্রের ভোটের চিত্র তুলে ধরে চ্যানেল টুয়েন্টিফোর। এক ঘন্টায় ওই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন মাত্র তিনজন। ১১টা ৫ মিনিটে ঢাকা-১৮ আসনে উত্তরা মডেল স্কুল এন্ড কলেজের চিত্র দেখায় বাংলাভিশন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত একটি ভোটকওে ভোট সংখ্যা ২০ অতিক্রম করতে পারেনি। একই চ্যানেল নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জের ভোটকেন্দ্রগুলোর সরাসরি চিত্র দেখিয়ে ভোটারদের অনুপস্থিতির কথা জানায়। দুপুর ১১টা ৪০ মিনিটে নির্বাচন কমিশন থেকে চ্যানেল টুয়েন্টিফোর নির্বাচন কমিশন থেকে সরাসরি সম্প্রচারে জানায়, কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে ভোটাররা সকালে কেন্দ্রে যায়নি।

দুপুর পৌনে ১টায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসা গেন্ডারিয়া ভোটকেন্দ্রে অনুপস্থিতির কথা জানায়। সূত্রাপুর কবি নজরুল সরকারি কলেজে দুপুর ১টা পর্যন্ত ভোটারবিহীন থাকলেও প্রার্থী কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ৬০ শতাংশ ভোট পড়বে। বাংলাভিশন ঢাকা-১৭ আসনের সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে জানায়, দুপুর ১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ওই কেন্দ্রে ভোটারের তেমন কোনো উপস্থিতি নেই। ২৯২১ জনের মধ্যে ১০০ জনের মতো ভোট দিয়েছেন। পুরো কেন্দ্র ছিল ফাঁকা। বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে একুশে টেলিভিশনে পল্লবীর কালশী ইসলামিয়া মাদ্রাসার খবর জানিয়ে বলা হয়, সেখানে ভোটারদের কোনো উপস্থিতি নেই। একুশে টেলিভিশন সাড়ে ৩টার দিকে জানায়, মিরপুরের ওই কেন্দ্রে আগের দুই ঘন্টায় ভোট পড়েছে দুটি। : সকাল থেকে নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগের নেতারা শৈত্যপ্রবাহ, কুয়াশা ও শীতের কারণ দেখিয়ে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কথা স্বীকার করেন।

তারা বলেন, দুপুরের পর থেকে ভোটার বাড়বে। কিন্তু দিন শেষে দেখা গেছে, দুপুরে কিংবা বিকালে কোনো সময়ই ভোটাররা কেন্দ্রে যাননি। কিছু কিছু কেন্দ্রে ব্যাপক জাল ভোট হয়েছে। দুপুরের পরও তারা ফাকা কেন্দ্রগুলোতেই ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট পড়বে বলে দাবি করেন। ৫ জানুয়ারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ও পরদিন পত্রিকাগুলোর ওই কলঙ্কিত নির্বাচনের প্রধান সাক্ষী।  এর আগে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে টানা হরতাল, অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি জোট। এতে দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী থেকে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার আগে ও পরে মানুষ এ ধরনের আন্দোলন কখনো দেখেনি। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির যৌথবাহিনীর দেখামাত্র গুলি, অপহরণ, গুমসহ নির্যাতনের লোমহর্ষক নির্যাতনকে উপেক্ষা করে জনতা সরকারের বিরুদ্ধে সারাদেশেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সরকার ও বিরোধী পরে মধ্যে নির্বাচন ইস্যুতে সংলাপ হলেও কোনো ধরনের সমঝোতা হয়নি। জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত তারানকো বাংলাদেশে এসে দুই দল ও স্পিকারে সাথে বৈঠক করে অনেক চেষ্টা করলেও একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও ইনকুসিভ নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাজি করাতে পারেননি আওয়ামী লীগকে।

সাংবাদিক: লেখক ও কলামিস্ট

About banglamail

Check Also

বাসার ভাড়াটিয়াকে জিম্মি করে তিন কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছেন শেখ রেহানা !

আমরা কেউই শতভাগ ফেরেস্তা না, মানুষ। তাই ভূল করি, পাপ করি! কিন্তু কেউ একজন বলতে …