তিন বছরেই আঙুল ফুলে কলাগাছ আ’লীগ সাংসদ আমজাদ !

দলের সঙ্গে দূরত্ব, চলেন নিজের লোকজন নিয়ে। স্ত্রী, সন্তান ও জামাতারা নিয়ন্ত্রণ করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পে টাকা বরাদ্দ হয় কিন্তু কাজ হয় নামমাত্র। তিনি ও তাঁর নিকটাত্মীয়রা একের পর এক কেনেন জমি। নির্মাণ করেছেন একাধিক বাড়ি। এসব অভিযোগ সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ) আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ গাজী ম ম আমজাদ হোসেন ওরফে মিলনের বিরুদ্ধে। সাংসদ হওয়ার তিন বছরেই তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এসব সম্পদ দুর্নীতি আর লুটপাটের ফসল—এই অভিযোগ দলেরই নেতা-কর্মীদের।

সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের উপনির্বাচনের জন্য ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী আমজাদ হোসেন ১৫ বিঘা কৃষিজমি ও ৩৮ শতক অকৃষিজমির মালিক। এর বাইরে তাঁর টিনশেডের একটি বাড়ি আছে। আর নিজের নামে সাড়ে ১১ লাখ এবং স্ত্রীর নামে ৩ লাখ টাকা আছে। এ ছাড়া নিজের ব্যাংক হিসাবে ১ লাখ টাকা, একটি পুরোনো মাইক্রোবাস (মূল্য ৪ লাখ টাকা) ও ৩২ ভরি স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি আসবাবসহ অল্প কিছু অস্থাবর সম্পদ আছে। হলফনামায় নিজের বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে কৃষি খাতে ৪০ হাজার ও ব্যবসা থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের ৫০ হাজার টাকা ও স্ত্রীর ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে।

তিন বছরের ব্যবধানে আমজাদ হোসেন এখন দুটি দোতলা ও একটি একতলা বাড়ির মালিক। এর বাইরেও বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। কেবল ২০১৫ সালেই সাংসদ ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ জমি নিবন্ধন করার তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া সাংসদ আমজাদ তাঁর নির্বাচনী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পদ থেকে অন্যদের সরিয়ে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের বসিয়েছেন। বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন তাঁরাই। এসব প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধান, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে সাংসদ আমজাদের বিষয়ে এমন তথ্য পেয়েছে প্রথম আলো। পাশাপাশি সাংসদের বিষয়ে দলের নেতাদের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগের কপি প্রথম আলোর হাতে এসেছে।জেলা আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে দেওয়া ওই অভিযোগপত্রে তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হক ও সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিত কুমার কর্মকারের সই রয়েছে।

সঞ্জিত কুমার কর্মকার প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদ আমজাদ হোসেনের দুর্নীতি-অনিয়মের শেষ নেই। অর্থ লুটপাট আর প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। সাংসদ দলীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেন না। নিজের বাহিনী নিয়ে চলছেন। বিষয়গুলো দলের নেতাদের লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

আমজাদ হোসেন বর্তমানে জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। তিনি দুবার তাড়াশের মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ছিলেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। ১৯৯০ সালে ও ২০০৯ সালে তাড়াশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন। ২০১৪ সালে সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ ইসহাক হোসেন তালুকদারের মৃত্যুর পর ১ ডিসেম্বরের উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হন তিনি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘পরিবারতন্ত্র’

সাংসদ হিসেবে শপথ গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যে সাংসদ নিজে নওগাঁ শাহ শরিফ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজ ও তাড়াশ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হন। তাঁর স্ত্রী হোসনেয়ারা ডেইজী হয়েছেন দোবিলা ইসলামপুর আলিম সিনিয়র মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সলঙ্গা ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য। তিনি ছিলেন নওগাঁ শাহ্ শরিফ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক। সেখান থেকে এনে তাঁকে তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ করা হয়েছে।

প্রয়াত সাংসদ ইসহাকের সময়ে তাড়াশ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হন উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা সঞ্জিত কুমার কর্মকার। তাঁকে সরিয়ে আমজাদ তাঁর বড় মেয়ে হোসনেয়ারা লাভলীকে সভাপতি করেন। সাংসদের বড় ছেলে ম ম জাকির হোসেন ওরফে জুয়েল হয়েছেন বারুহাঁস উচ্চবিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি। ছোট মেয়ে হোসনেয়ারা নাসরিন আছেন তাড়াশ পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদকের পদে। এ ছাড়া তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামানকে সরিয়ে দোবিলা উচ্চবিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি করা হয় সাংসদের আস্থাভাজন আঙ্গুর মাস্টারকে।

আঙ্গুর মাস্টার সভাপতি হওয়ার পর দোবিলা উচ্চবিদ্যালয়ে চারজনকে টাকার বিনিময়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চারজনই বিএনপি-জামায়াতের অনুসারী।

তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল হক ছিলেন দোবিলা ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি। তাঁকে সরিয়ে সাংসদের নিকটাত্মীয় মোকতার হোসেনকে সভাপতি করা হয়।

দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, সাংসদ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ-বাণিজ্য হয়েছে। কিন্তু সবাই নীরবে এসব সইছেন। কারণ, কেউ প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হতে হয়।

গত বছর তাড়াশ বিআরডিবির চেয়ারম্যান নির্বাচনের মনোনয়নপত্র তোলেন নওগাঁ ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী। সন্ত্রাসী বাহিনী তাঁর বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখায় ও মনোনয়নপত্র কেড়ে নেয়। পরে সাংসদের ছোট জামাতা গোলাম রব্বানী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান হন। গোলাম রব্বানী উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। তিনি আগে কখনো সাংবাদিকতা করেননি। কিন্তু নামসর্বস্ব একটি পত্রিকার প্রতিনিধি পরিচয়ে এখন তাড়াশ প্রেসক্লাবের সভাপতি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সাংসদ আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমি কাউকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে দায়িত্ব দিইনি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষই তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনায় এনে আমার পরিবারের লোকজনকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।’

বাড়ি ও জমিজমা

আমজাদ হোসেন তাড়াশ উপজেলা পরিষদের পাশে একটি দোতলা বাড়ি ও উপজেলার প্রফেসরপাড়ায় একটি একতলা বাড়ি বানিয়েছেন। তাড়াশ শহরে পৈতৃক আধা পাকা বাড়িটি ভেঙে আধুনিক দোতলা ভবন করেছেন। রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী সিনেমা হল রোড এলাকায় ১৪ শতক জায়গা কিনে পাকা সীমানাপ্রাচীর ও ফটক বানিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া নিজের ও স্ত্রী-সন্তানদের নামে অনেক জমি কিনেছেন। এসবই হয়েছে সাংসদ হওয়ার পর।

তাড়াশ সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে পাওয়া একটি তালিকার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালেই সাংসদ আমজাদ ও তাঁর অনুসারীরা বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হয়েছেন। সাংসদ নিজের নামে ওই বছরের ২০ এপ্রিল ১০ লাখ টাকার ১৫৫ শতক জমি, ১১ মে ২৫ লাখ টাকা মূল্যের ১৩২ শতক জামিসহ বাড়ি এবং ৩ অক্টোবর ৬ লাখ টাকা মূল্যের ১১৬ শতক জমি নিবন্ধন করেছেন।

স্ত্রী হোসনেয়ারা ডেইজীর নামে ৪ মে ৯ লাখ টাকা মূল্যের বাড়ি ও ১১ অক্টোবর ৫ লাখ ৫১ হাজার টাকার ১৪৪ শতক জমি কেনা হয়েছে। বড় মেয়ে হোসনেয়ারা লাভলীর নামে ১২ জানুয়ারি ১৭ লাখ টাকা মূল্যের ১৩২ শতক, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকার ৬৪ শতক জমি, ২০ মে ৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের ৬৬ শতক জমি, ১৭ আগস্ট ৮ লাখ ১০ হাজার টাকার ১৫৬ শতক জমি ও ৩১ অক্টোবর ৫ লাখ টাকার ৭০ শতক জমির দলিল করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাংসদের জামাতা গোলাম রব্বানীর নামে একই বছরের ১৯ জানুয়ারি ৩ লাখ টাকার ২০ শতক, ২৩ ফেব্রুয়ারি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার ১০ শতক এবং ৭ সেপ্টেম্বর ৪ লাখ ১১ হাজার টাকার ১০ শতক জমি কেনা হয়েছে। সাংসদের বড় ছেলে জাকির হোসেনের নামে ২৫ মে ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকার ৩০ শতক, ৭ জুন ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ৬১ শতক, ৩১ আগস্ট ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার ৭০ শতক, ৫ অক্টোবর ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকার ৩৫ শতক জমির দলিল করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সাংসদ আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছি। তখন থেকেই আমার বেশ কিছু সম্পত্তি রয়েছে। আমার দুই ছেলে ব্যবসা করে। তারা তাদের টাকায় ও স্ত্রীর চাকরির টাকায় বাড়ি ও কিছু জমি কিনেছে। সেখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

প্রকল্পে দুর্নীতি

তাড়াশ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরে দাখিল করা কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উপজেলায় তারা পাম্প, হ্যান্ড টিউবওয়েল এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ১৭টি প্রকল্প নেওয়া হয়। সাংসদের দুই জামাতা রবিউল ইসলাম ও গোলাম রব্বানী তারা পাম্পের দুটি প্রকল্প এবং মেয়ে হোসনেয়ারা নাসরীন ও ছেলে জাকির হোসেন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের দুটি প্রকল্পের কাজ পান। বাকি ১৩ প্রকল্পের কাজ পাওয়া ব্যক্তিরাও সাংসদের আস্থাভাজন।

তাড়াশ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের (পিআইও) আওতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সাংসদের দেওয়া বরাদ্দে বিভিন্ন সড়ক সংস্কার ও মাটির কাজের প্রকল্প ছিল। কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) কর্মসূচির ১৬টি প্রকল্পে দুই ধাপে ২০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ আসে। আর টিআর (গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ) কর্মসূচির আওতায় ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল কাবিখা প্রকল্পে ১৩০ মেট্রিক টন, কাবিটা প্রকল্পে ১৯ লাখ ২৬ হাজার ৭৮৮ টাকা ও টিআর কর্মসূচিতে ৬৫ মেট্রিক টন চাল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কাবিটা প্রকল্পের দুই ধাপে ৪৩ লাখ ৬৩ হাজার ৭৮৫ টাকা, টিআর কর্মসূচির দুই ধাপে ৫৬ মেট্রিক টন চাল ও ১৯ লাখ ৪৯ হাজার ২২৩ টাকা।

সরেজমিন

২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রকল্পগুলোর একটি ছিল ‘মাগুড়া বিনোদ আছিরন আবদুর রহমান টেকনিক্যাল স্কুল কলেজ’সহ দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দুটি বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন। কাবিটার এ প্রকল্পে ৪ লাখ ৫ হাজার ৬৫৩ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু প্রকল্পে দেওয়া ঠিকানায় ২৬ নভেম্বর গিয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। টিনের এক কক্ষের একটি তালাবদ্ধ ঘর আছে মাত্র। আশপাশের লোকজনও সেখানে কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলতে দেখেননি। এমনকি শিক্ষা অফিসে খোঁজ নিয়ে ওই নামে কোনো অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়নি।

আর যে দুজনের বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর কথা বলা হয়েছে, তাঁদের একজন সাংসদের ছোট ছেলে জর্জিয়াস মিলনের স্ত্রী ইতি খাতুন। অপরজন সাংসদের দূরসম্পর্কের নাতি রিমন। দুটি বাড়িই তাড়াশ শহরের উত্তরপাড়ায়।

সব প্রকল্পের কাজই সাংসদের জামাতা ও ছেলেরা নিজেরা, নয়তো তাঁদের অনুগত ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রকল্পগুলোতে বিপুল অঙ্কের টাকা বরাদ্দ হলেও নামমাত্র কাজ হয়েছে। উপজেলার আটটি ইউপির মধ্যে সাতটির আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যানরাই এসব অভিযোগ করেছেন। তাঁরা হলেন সদর ইউপির চেয়ারম্যান বাবুল শেখ, দেশীগ্রাম ইউপির আবদুল কুদ্দুস, বারুহাঁস ইউপির মোকতার হোসেন, তালম ইউপির আব্বাসউজ্জমান, মাধাইনগর ইউপির মির্জা আবু হাসান, মাগুড়া বিনোদ ইউপির আতিকুল ইসলাম ও শগুনা ইউপির আবদুল্লাহেল বাকী।

অভিযোগের বিষয়ে সাংসদ আমজাদ বলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েরা সবাই পৃথকভাবে বসবাস করে। সে কারণে তাদের নামে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। এটা দোষের কিছু নয়। আমার ছেলে ও জামাতারা কোনো সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নয়; আগেও কখনো ছিল না।’

ফসলি জমিতে প্রকল্পের টাকায় পুকুর

সাংসদ আমজাদ হোসেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সদস্য। অথচ নিয়মনীতি না মেনে তিনিই তাড়াশ সদর ইউনিয়নের কোহিত গ্রামে প্রায় ৩০ বিঘা ফসলি জমিতে ব্যক্তিগত পুকুর খনন করছেন। শুধু তা-ই নয়, কৌশলে পুকুরটি খনন করিয়ে নিচ্ছেন একটি সড়ক সংস্কারের প্রকল্পের টাকা দিয়ে। স্থানীয় কোহিত-মাঝুরিয়া রাস্তা সংস্কারের জন্য ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। সেই টাকা দিয়ে পুকুর খনন করে মাটি ওই সড়কে ফেলা হচ্ছে।

এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কামরুল আহসান বলেন, ‘মাটি কোথা থেকে এনে ফেলা হচ্ছে, এটি আমার দেখার বিষয় নয়। তবে পুকুর খননের কোনো প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ হয়নি।’

এদিকে ওই পুকুরের মধ্যে আছে স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীনের আড়াই বিঘা এবং সালমা বেগমের ২৮ শতাংশ জমি। তাঁদের অভিযোগ, তাঁদের জমির বদলে জমি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁরা জমি পাননি।

অভিযোগের বিষয়ে সাংসদ বলেন, এক ফসলি জমিতে তিনি নিজের টাকায় পুকুর খনন করছেন। পুকুরের মাটি তাঁর উদ্যোগেই রাস্তায় ফেলা হচ্ছে। আর সেখানে অন্যদের কিছু জমি থাকলেও তা বদল করে দেওয়া হয়েছে।

‘আমজাদ লীগ’, ‘আমজাদ কলোনি’

বিভিন্ন ইউপির চেয়ারম্যান ও দলীয় নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, সাংসদ আমজাদ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাত্তা দেন না। তিনি নিজের ছেলে, জামাতাসহ আত্মীয়স্বজন দ্বারা তৈরি নিজস্ব বাহিনী নিয়ে চলেন। এলাকায় এদের পরিচয় ‘আমজাদ লীগ’ বা ‘আমজাদ বাহিনী’। এই বাহিনী দিয়েই সাংসদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। এদের কাছে সাধারণ মানুষও জিম্মি।

তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংসদ নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দলীয় কোনো কর্মসূচি পালনে তাঁর আগ্রহ নেই। আমরা করতে চাইলেও নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, তাড়াশ সদরের খাদ্যগুদাম এলাকায় জেলা পরিষদের অল্প কিছু জায়গা সাংসদের আত্মীয়রা ইজারা নেন। কিন্তু তাঁরা অনেক জমি দখল করে বিধিবহির্ভূতভাবে পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন। ওই এলাকাটি এখন ‘আমজাদ কলোনি’ নামে পরিচিতি।

Comments Us On Facebook: