Thursday , October 18 2018
Home / অন্যান্য / যে কারণে দুই মাসেও ওঠেনি পদ্মা সেতুর দ্বিতীয় স্প্যান

যে কারণে দুই মাসেও ওঠেনি পদ্মা সেতুর দ্বিতীয় স্প্যান

দেশের সর্ববৃহৎ অবকাঠামো স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে প্রথম স্প্যান উঠেছে এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর। এরপর পেরিয়ে গেছে দুই মাস। কিন্তু এখনও ওঠেনি দ্বিতীয় স্প্যান। এটি উঠতে পারে আগামী মাসে। বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানালেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি জাতীয় সংসদকেও জানিয়েছেন, দ্বিতীয় স্প্যান ওঠানোর পর থেকে প্রতি সপ্তাহেই একটি করে স্প্যান তোলা সম্ভব হবে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটির ওপর প্রথম স্প্যান বসানো হয়। এরপর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প’ পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম নিজ নিজ প্রতিক্রিয়ায় জানান, এখন থেকে প্রতি মাসেই একটি করে স্প্যান ওঠানো সম্ভব হবে। তাদের ব্যাখ্যা ছিল— জাজিরা পয়েন্টে পিলারের কাজ শেষের দিকে। প্রতি মাসে একটি করে পিলার দাঁড়ালেই ওপরে স্প্যান বসানো সম্ভব।

এমন প্রত্যাশার ফলে অনেকের আশা ছিল, অক্টোবরে দ্বিতীয় স্প্যান উঠবে পদ্মা সেতুতে। কিন্ত তা হয়নি। সেতুর ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলার দুটির কাজ স্প্যান ওঠানোর মতো করে পুরোপুরি উপযুক্ত করা যায়নি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয় প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামের কাছে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘প্রতি মাসে একটি করে স্প্যান ওঠানো হবে এমন কোনও সিদ্ধান্ত তো ছিল না। এর বেশি এখন আর কিছুই বলতে পারবো না।’

তবে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের যে কোনোদিন দ্বিতীয় স্প্যানটি বসানো সম্ভব হবে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেন এই প্রকৌশলী। তিনি বলেন, ‘আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করছি।’ কিন্তু কারিগরি কারণে তা হয়ে ওঠেনি। জানা গেছে, গত দুই মাসে স্প্যান তোলার চেয়ে পিলারের কাজ করাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পিলারগুলো দাঁড়িয়ে গেলে ওপরে স্প্যান বসানো সময়ের ব্যাপার।
পদ্মার তলদেশে পানির স্রোত, মাটির অবস্থান ও মাওয়া পয়েন্টে নদীভাঙন পরিস্থিতি এ প্রকল্পের কাজকে কিছুটা জটিল করেছে। এ বছরের অতিবৃষ্টি ও অত্যধিক পানির স্রোতের কারণে কাজ বিঘ্নিত হয়েছে।

পদ্মা সেতু (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্টে নদীর স্রোত অন্যদিকে সরিয়ে দিয়ে পিলারের কাজগুলো সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। কারণ বর্ষা মৌসুমে এই এলাকার নদী ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করে। তখন কাজ করা খুবই কঠিন। একদিকে নদী ভাঙন, অন্যদিকে পানির প্রবল স্রোত। উভয়কে জয় করে কাজ করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। অবশ্য সামনে শুকনো মৌসুম। চলবে মার্চ পর্যন্ত। এই পাঁচ মাসের মধ্যে মাঝনদীতে পিলারের অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করতে চায় এলইডি।

প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রমত্তা পদ্মার প্রবল স্রোত ও ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে চলছে নির্মাণযজ্ঞ। নদীর তলদেশে মাটির স্তরের গঠন নিয়ে জটিলতা কাটিয়ে বর্ষায় নদীর প্রবল স্রোতকে উপেক্ষা করে কাজ চলছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা জয় করে মূল সেতুর পাইলিংয়ের কাজ চলছে পদ্মার দুই পাড়ে।’

আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, সেতুতে মোট ৪১টি স্প্যানের মধ্যে ১১টি স্প্যানের প্রয়োজনীয় স্টিল ট্রাসের মালামাল পৌঁছেছে প্রকল্প এলাকায়। এর মধ্যে তিনটির সংযোজন শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যেই আরও একটি অত্যাধুনিক হ্যামার প্রকল্প এসে পৌঁছেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এর কাজ দ্রুত করার জন্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায়।জাজিরা অংশে সব পিলারের পাইলিংয়ের মাটি পরীক্ষার কাজও সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত ছয়টি পিলারের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই শেষ হচ্ছে ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলারের কাজ। ৩৮ নম্বর পিলারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই দুটি পিলার ধরে আরও দুটি স্প্যান বসবে শিগগিরই।

পদ্মা সেতু (ছবি: ফোকাস বাংলা)জানা যায়, নদীতে মূল সেতুর মোট ২৪০টি পাইলের মধ্যে ৭৫টি বসেছে। এছাড়া দুই পাড়ের দুটি ট্রান্সজিশন পিলারের ৩২টির মধ্যে ১৬টি স্থাপন হয়েছে। এখন বাকি মাওয়া প্রান্তের ১ নম্বর ট্রান্সজিশন পিলারের ১৬টি পাইল। জাজিরা প্রান্তে সংযোগ সেতুর ১৮৬টি পাইল বসেছে। এখানে আর মাত্র ৭টি পাইল বাকি সংযোগ সেতুর (ভায়াডাক্ট) জন্য।৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের (পিয়ার) ওপর ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের প্রথম স্প্যান বসানোর ফলে পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। অবশ্য গত জুনের শেষ সপ্তাহে এই সেতু দৃশ্যমান করতে স্প্যান বসানোর কথা থাকলেও প্রকল্পের কারিগরি জটিলতার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। অবশেষে নির্মাণ কাজ শুরুর প্রায় দুই বছর পর ৩০ সেপ্টেম্বর ওঠে প্রথম স্প্যান।

সেতু কর্তৃপক্ষ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, জাজিরা প্রান্তের ১২ দশমিক ১১ কিলোমিটার ও মাওয়া প্রান্তের ১ দশমিক ৬৭ কিলোমিটারের সংযোগ সড়কের শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। জাজিরা প্রান্তে ভায়াডাক্টে ৪২টি পিলারে মোট ১৯৩টি পাইলের মধ্যে ১৯৮টি বা ৯৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। মাওয়া প্রান্তে ভায়াডাক্টে মোট ৩৯টি পিলারে ১৭২টি পাইলের মধ্যে মাত্র ১১টি পাইল বা ১১ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
সিনো হাইড্রোর সঙ্গে প্রায় ৮ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার চুক্তির মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা বা ৩৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মাওয়া প্রান্তের ১ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি ও ১ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার সড়ক মেরামতে ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

পদ্মা সেতু (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)পদ্মা সেতুর অগ্রগতি সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পদ্মা সেতুর মূল প্রকল্পে ৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। মূল সেতুর চুক্তিমূল্য ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। পুরো প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত মূল সেতুর কাজের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৪৯ শতাংশ। সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৪৭ শতাংশ। ৩০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম স্প্যান (সুপার স্ট্রাকচার) স্থাপন করা হয়েছে খুঁটির (পিলার) ওপর।

প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে আরও জানান, পদ্মা সেতুর রঙ হবে সোনালি। তবে রাতে সেতুটিতে জ্বলবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রঙ লাল ও সবুজ বাতি। সেভাবেই রাখা হবে বাতি। পদ্মা নদীর পানির স্তর থেকে ৫০ ফুট উঁচুতে বসবে প্রতিটি স্প্যান।

জানা গেছে, এই মুহূর্তে বসানোর জন্য পাঁচটি স্প্যান পুরোপুরি প্রস্তুত। ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা স্প্যানের লোড টেস্ট করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এই মহাযজ্ঞ। তদারকিতে যুক্ত আছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল। পদ্মা সেতুর কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এতে থাকবে মোট ৪২টি পিলার। এর মধ্যে ৪০টি নির্মাণ করা হবে নদীতে। বাকি দুটি পিলার থাকবে নদীর তীরে। নদীতে নির্মাণ করা প্রতিটি পিলারে পাইলিং করা হয়েছে ছয়টি করে। এর দৈর্ঘ্য গড়ে প্রায় ১২৭ মিটার। একটি পিলার থেকে আরেকটির দূরত্ব ১৫০ মিটার। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুতে দুটি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। এছাড়া দুই পাড়ের সংযোগ সেতুসহ এটি ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ।

banglatribune

About banglamail

Check Also

বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েও অসুস্থদের ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছেন জামায়াত নেতা ডাঃ আনোয়ারুল আজিম

জামায়াত মনোনীত লক্ষীপুর-৩ সদর আসনের এমপি প্রার্থী জনাব ডাঃ আনোয়ারুল আজিম সাহেব হাজির পাড়া ইউনিয়নে …