প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে বার বারই ব্যর্থ হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়

প্রশ্নফাঁস রোধে প্রত্যেক পাবলিক পরীক্ষার আগে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়। বলা হয়, এইবার প্রশ্ন ফাঁস হবে না। কিন্তু, কোন ক্রমেই ঠেকানো যাচ্ছে না প্রশ্নফাঁস চক্রের তৎপরতা। প্রত্যেকটি পাবলিক পরীক্ষায়ই প্রশ্নফাঁসের নজির সৃষ্টি হচ্ছে। এতে পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে, ভালো পরীক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছে। জনমনেও সরকার সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে।
সর্বশেষ, এই জেএসসিতেও প্রতিটি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে বিভিন্ন অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পাওয়া যাচ্ছে, যা হুবহু মিলেও যাচ্ছে। প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে এইবার নিয়ম করা হয়েছিল, পরীক্ষা শুরুর কমপক্ষে আধাঘন্টা আগে অবশ্যই পরীক্ষার্থীকে হলে ঢুকতে হবে। পরীক্ষার্থীরা এ নিয়ম অনুসরণ করেই পরীক্ষার হলে ঢুকছে। তারপরও চলমান এই জেএসসি পরীক্ষার প্রতিটির প্রশ্নপত্রই ফেইসবুকে পাওয়া গেছে; যার সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের পুরোপুরি মিল পেয়েছে শিক্ষার্থীরা।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিজ্ঞানের প্রশ্ন পাওয়া যায়। পরে পরীক্ষার মূল প্রশ্নের সঙ্গে এটি মিলিয়ে দেখা হয়। তাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও মূল প্রশ্নের মধ্যে হুবহু মিল পাওয়া যায়।
এদিন সকালে পরীক্ষার এক ঘণ্টা আগে রাজধানীর একটি স্কুলের সামনে সরেজমিনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেখেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। অভিভাবকদের জিজ্ঞেসা করতেই তারা তা লুকিয়ে ফেলেন।পরীক্ষা শেষের কিছুক্ষণ পর এক অভিভাবক মুখ খুলেন। তবে তার দাবি, ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পাননি। অন্য অভিভাবকের বরাতে তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি তারা প্রশ্ন পেয়েছেন। তারা উত্তর খুঁজে তাদের সন্তানকে বলে দিচ্ছেন।’ এ রকমের প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় অভিভাবকরা অত্যন্ত বিরক্ত। কারণ, এতে তাদের সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। সারা বছর লেখাপড়া করে পরীক্ষা দিতে এসে কোনও পরীক্ষার্থী যদি দেখেন, প্রশ্নটি আগেই ফাঁস হয়ে গেছে তাতে খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়াটাই স্বাভাবিক।
গত ১ নভেম্বর সারাদেশে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এদিন থেকেই প্রতিটি পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র পাওয়া যাচ্ছে ফেসবুক ও হোয়াট্স অ্যাপ গ্রুপে। প্রায় সবগুলো পরীক্ষারই প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে পরীক্ষার অন্তত ১ ঘণ্টা আগেই।
গত সোমবার অনুষ্ঠিত হয় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। ওই পরীক্ষা শুরুর ৫৫ মিনিট আগে প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় একটি ফেইসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে। মঙ্গলবারও পরীক্ষা শুরুর আগে একই মেসেঞ্জার গ্রুপে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার প্রশ্ন চলে আসে, সেটাও মিলে যায়।
সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ফেসবুকে পাওয়া প্রশ্নের মিল পাওয়ার পর সোমবার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, ফেইসবুক একাউন্টের আইডি লিঙ্কটিসহ প্রশ্নের জন্য অর্থ চেয়ে দেয়া মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট নম্বর জানিয়ে তাকে ই-মেইল করা হয়। তখন তিনি বলেছিলেন, পুলিশের সহায়তা নিয়ে বিষয়টি দেখে অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে।
কিন্তু তার মধ্যেই মঙ্গলবার পরীক্ষা শুরুর আগে একই মেসেঞ্জার গ্রুপে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার প্রশ্নও চলে আসে, তাও মিলে যায়।
এরপর যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আপনাদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বিটিআরসি (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে) জানানো হয়েছে। তারা বিষয়টি দেখছে, (অপরাধীকে) ধরার চেষ্টা করছে।” কিন্তু, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই গ্রুপের কাউকে ধরা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, এসব প্রশ্নফাঁস কেলেংকারিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোচিং সেন্টারগুলো জড়িত। তারা এ খাতে মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। এদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী, যে কারণে প্রশ্নফাঁসের শিকড় খুঁজে বের করা বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়ে উঠে না। তদন্ত কাজে যারা নিয়োজিত থাকেন তারা কোনও না কোনভাবে এক পর্যায়ে ম্যানেজ হয়ে যান। তবে ইদানিং এমন অভিযোগও উঠেছে যে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা মন্ত্রণালয় নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে গিয়ে প্রশ্নফাঁসের বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন।
সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আছেন মহাজোট সরকারের শুরু অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে। দীর্ঘদিন এ মন্ত্রণালয়ে থাকলেও তিনি এ পর্যন্ত প্রশ্নফাঁস রোধে উল্লেখযোগ্য কোনও সাফল্য দেখাতে পারেননি। বরং তার আমলেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নফাঁস কেলেংকারি হয়েছে। ২০১৪ সালে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসকে কেন্দ্র করে সারাদেশে তুমুল হইচইও বেধে যায়। প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রশ্নফাঁস বন্ধ করবেন। কিন্তু, তাতে তিনি যে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, চলমান জেএসসি পরীক্ষাই এর নজির, মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Comments Us On Facebook: