বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক ক্রসফায়ারের সৌদি ভার্সন, হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা !

২৪ ঘন্টার ব্যবধানে সৌদি রাজপরিবারের ২ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। আসলে ‘মৃত্যু’ বললে ভুলভাবে বলা হয়। দুই রাজকুমারকে ক্রসফায়ারে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মতো এখন রাজনৈতিক ক্রসফায়ার সৌদিতেও শুরু হলো।

সোমবার রাতে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাবেক ক্রাউন প্রিন্স মুকরিন বিন আব্দুল আজিজের ছেলে মানসুর বিন মুকরিন মারা যান। কিন্তু এটিকে দুর্ঘটনা বলতে নারাজ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বিশেষজ্ঞ। তুরস্কের ইয়েনি শাফাক পত্রিকার কলামিস্ট মুহাম্মদ আজাদ লিখেছেন, এই দুর্ঘটনা তার পূর্বাপর ঘটনার সাথে মেলালে অন্য ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, তার মতে মানসুরকে হত্যা করা হয়েছে ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার মাধ্যমে।

এরপর মঙ্গলবার সকালে সাবেক বাদশাহ ফাহাদের ছেলে আব্দুল আজিজ বিন ফাহাদকে গ্রেফতারের সময় গুলি করে হত্যা করা হয় বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। যদিও সৌদি সরকার এই খবরকে অস্বীকার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম বলেছে, গ্রেফতারের সময় প্রিন্স আব্দুল আজিজ প্রতিরোধ করতে গেলে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। কিছুক্ষণ পরে তার মৃত্যু হয়।

রাজনৈতিক সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে হত্যা করা সৌদি আরবে নতুন না হলেও হত্যার পদ্ধতিটি নতুন। এর আগে কাউকে হত্যা করতে হলে রাজকীয় আদালতের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে আসা হতো। এবং এরপর জল্লাদের মাধ্যমে ন্যুনতম আইনি প্রক্রিয়ায় হত্যা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে শুরু হলো বাংলাদেশের মতো প্রতিপক্ষকে গ্রেফতার করে ক্রসফায়ারে দেয়া।

এবার ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সৌদি প্রিন্স নিহত

সৌদি আরবে দুর্নীতির অভিযোগে বড় ধরনের ধরপাকড় ও হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে প্রিন্স মানসুর বিন মাকরিন নিহত হওয়ার ২৪ ঘণ্টা না যেতেই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আরেক প্রিন্স নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহত প্রিন্সের নাম আবদুল আজিজ (৪৪); যিনি প্রয়াত বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের ছোট ছেলে।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে গত শনিবার থেকে সৌদি আরবে দুর্নীতিবিরোধী যে অভিযান শুরু হয়েছে, তাকে সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘সৌদি বাদশাহ সালমান ও যুবরাজের ওপর আমার ব্যাপক আস্থা রয়েছে, তাঁরা যা করছেন তা যথার্থভাবে বুঝেই করছেন। তাঁরা এখন যাদের প্রতি কঠোর হয়েছেন, ওই লোকগুলো বছরের পর বছর ধরে তাদের দেশকে শুষে খাচ্ছে। ’

শনিবার বাদশাহ সালমান এক ডিক্রির মাধ্যমে যুবরাজের নেতৃত্বে নতুন দুর্নীতি দমন কমিটি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই অন্তত ১৭ প্রিন্স, বর্তমান চার মন্ত্রী এবং অন্তত ৩০-৩৫ জন সাবেক মন্ত্রী-উপমন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন বাদশাহর পৃথক ডিক্রিতে ন্যাশনাল গার্ডবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহর ছেলে প্রিন্স মেতিব বিন আবদুল্লাহ এবং অর্থমন্ত্রী ও নৌবাহিনী প্রধানকে বরখাস্ত করা হয়। এ নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, শনিবারের অভিযানে প্রিন্স আবদুল আজিজও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। গ্রেপ্তার চেষ্টা ঠেকানোর জন্য শুরু হওয়া বন্দুকযুদ্ধে তিনি আহত হন। এরপর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার তাঁর মৃত্যু হয়।

আবার কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই গুলিতে নিহত হন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এফবিআই) সাবেক স্পেশাল এজেন্ট আল এইচ সৌফানও এক টুইট বার্তায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রিন্সের নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছেন। তবে এ খবরের সত্যতা সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি, আবার অস্বীকারও করেনি।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, সৌদি রাজ পরিবারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই দ্বন্দ্বের কারণে এসব গ্রেপ্তার ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। আবার কেউ বলছেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতাকে আরো সুসংহত করতেই এসব ঘটনা ঘটছে। দেশটির লাটাই এখন মূলত যুবরাজের হাতে। তিনি সৌদি আরবকে কট্টরপন্থী অবস্থান থেকে বের করে মধ্যপন্থী ইসলামিক দেশে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

গত শনিবার বড় ধরনের ধরপাকড় ছাড়াও আরো দুটি বড় ঘটনা ঘটে রিয়াদে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে বেশ নাড়া দিয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি জীবনের শঙ্কা প্রকাশ করে নিজ দেশ ছেড়ে রিয়াদে বসে নাটকীয়ভাবে ওই দিন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ঘোষণায় নিজের পদত্যাগের জন্য ইরান ও হিজবুল্লাহকে দায়ী করেন তিনি। তাঁর পদত্যাগে লেবাননে রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়। লেবাননের ইরান সমর্থিত শিয়া হিজবুল্লাহগোষ্ঠীর আগ্রাসনকে কারণ দেখিয়ে সৌদি বলছে, লেবাননের সরকারকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ওই দিন সন্ধ্যার দিকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, কিং খালিদ বিমানবন্দর এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দটি ছিল ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের শব্দ। হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। গতকাল যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোন আলাপে যুবরাজ বলেন, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ইরানের রকেট সরবরাহ সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের শামিল। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

bdtoday

Comments Us On Facebook: