Wednesday , October 24 2018
Home / আইন ও বিচার / সরকারের হাত আদালতের চেয়েও লম্বা

সরকারের হাত আদালতের চেয়েও লম্বা

মঙ্গলবার, ঈদের আগের দিন জামিন পেলেন অভিনেত্রী নওশাবা। এর আগে জামিন পেয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করার দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। নওশাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর ফেসবুক আইডি থেকে মানুষ মারার গুজব ছড়ানো হয়েছিল। তার পরও তিনি জামিন পেয়ে কন্যার সঙ্গে ঈদ করেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।কিন্তু নিরাপদ সড়কের দাবিতে যখন আন্দোলন চলছিল, সে সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া শহিদুল আলম এখনো কারাগারে। আদালত তাঁর জামিনের আবেদন নাকচ করে দেন। এরপর শহিদুল আলমের স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ রিট করলে হাইকোর্ট পিজি হাসপাতালে নিয়ে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় চিকিৎসকেরা তিনি সুস্থ আছেন বলে মত দেন। সেই থেকে শহিদুল আলম কারাগারেই আছেন।

শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায়। অভিযোগ, তিনি সরকারের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য রেখেছেন। ফেসবুকে শিক্ষার্থী আন্দোলন সম্পর্কে নিজের মতামত প্রকাশের পাশাপাশি শহিদুল আলম আল জাজিরা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যাতে তিনি শিক্ষার্থী আন্দোলনসহ অনেক বিষয়ে নিজের মত তুলে ধরেছেন। ভবিষ্যতেও ধরবেন বলে জানিয়েছেন। কোনো গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের বিরোধিতা করা অপরাধ নয়। তিনি কথা বলেছেন আগামী নির্বাচন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ইত্যাদি নিয়ে। এসব নিয়ে আরও অনেকে কথা বলেছেন।কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগে শহিদুল আলমকে যে কায়দায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, অনৈতিকও। যদি তাঁর বিরুদ্ধে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তার ভিত্তিতে মামলা হবে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হবে। এরপর সেই পরোয়ানা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। কিন্তু শহিদুল আলমের ক্ষেত্রে দেখা গেল, সাদাপোশাকে একদল পুলিশ রাতের অন্ধকারে তাঁর বাড়িতে হানা দিয়ে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। এ সময় বাড়ির সিসি ক্যামেরাও খুলে নিয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

এ রকম ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অতীতে আরও অনেক ঘটেছে; পরে যাদের মধ্যে কারও কারও আর হদিস মেলেনি। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের মুখস্থ জবাব, এ ব্যাপারে তাঁরা কিছুই জানেন না। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম করে দুর্বৃত্তরাও বাড়ি থেকে মানুষ ধরে নিয়ে যায়। এ কারণে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল, সাদাপোশাকে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন না। আসামি গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের বিষয়ে উচ্চ আদালতের আরও কিছু নির্দেশনা আছে, যা কোনো সরকারের আমলেই মানা হয় না। এ ক্ষেত্রে যখন যাঁরা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা এ ধরনের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে আবার তাঁরাই একই অস্ত্র প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগের নেতাদের গ্রেপ্তার-রিমান্ডের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করা হলে বিচারক সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘সরকারের হাত লম্বা জানি। কিন্তু আদালতের হাত তার চেয়েও বেশি লম্বা।’ এখন মনে হচ্ছে সরকারের হাত আদালতের চেয়েও লম্বা। না হলে তারা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কীভাবে অমান্য করে?শহিদুল আলমের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিচারক আইনজীবীর সওয়ালের জবাবে বলেছেন, ‘ভাগ্য ভালো তিনি গুম হয়ে যাননি।’ তাঁর এই বক্তব্য সরকারের জন্য একটি বার্তা বলেই মনে হয়।

বিভিন্ন মহল থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীদের জামিন দেওয়ার জন্য দাবি জানানো হয়েছিল। প্রথম আলো একই সপ্তাহে একাধিক সম্পাদকীয় লিখে শিক্ষার্থীদের মুক্তি চেয়েছে। অনেক কলাম লেখক তাঁদের লেখায় একই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গণফোরামের সভাপতি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনও প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য আরজি জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সরকার আটক প্রায় সবাইকে ঈদের আগে ছেড়ে দিয়েছে। এই উদ্যোগকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আইনের চোখে কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিচার হবে। তিনি শাস্তি পাবেন। কিন্তু মামলা করেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটকে রাখা তথা আইনি লড়াই থেকে বঞ্চিত রাখার প্রবণতা অন্যায়ই বলেই মনে করি।

প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছিল, ‘…দুঃখের বিষয়, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও দৃক গ্যালারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলমকে যে উপায়ে “গ্রেপ্তার” করা হয়েছে, তাতে আইনের শাসনের মূলনীতি মার খেয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন নির্বাচনী বছরটিতে সরকারি দলের জন্য যথেষ্ট বিব্রতকর হতে পারে জেনেও এ রকম হঠকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল, তা আমাদের কাছে বিস্ময়কর। ১১ নোবেল বিজয়ীসহ ২৮ বিশিষ্ট ব্যক্তির রোববারের বিবৃতি এবং বিশ্বের মর্যাদাসম্পন্ন পত্রিকাগুলোর তরফে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে, তাতে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করার অভিযোগটি গুরুত্ব পেয়েছে। …ঈদের আগে জামিনে মুক্তিদানে সরকার যে একটি উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে একটা অধিকতর মানবিক ও সার্থক রূপ দেওয়া হোক। বিতর্কিত ৫৭ ধারার আওতায় যাঁরা অভিযুক্ত, তাঁদের জামিন লাভের সুযোগ ঈদের অবকাশে মহানগর দায়রা জজ নিশ্চিত করতে পারেন। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে এই আদালত জামিনের দরখাস্ত ছুটির মধ্যেও শোনার এখতিয়ার রাখেন।’

সরকারের কারণে ঈদের আগে শিক্ষার্থীরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আমরা আশা করি শহিদুল আলমের বিষয়েও সরকার একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবে। তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে, সেটি গুরুতর নয় এবং অবশ্যই জামিনযোগ্য। যাঁদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর কিংবা গুজব ছড়ানোর মতো মারাত্মক অভিযোগ আনা হয়েছিল, তাঁরা যদি জামিন পেতে পারেন, তাহলে শহিদুল আলম কেন নন? কেন তাঁকে দিনের পর দিন কারাগারে আটক থাকতে হবে?শহিদুল আলম একজন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান আলোকচিত্রী। তিনি দৃক গ্যালারি ও পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা। এই পাঠশালায় ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শিক্ষার্থীরা আসেন বাংলাদেশে আলোকচিত্র শিখতে। আলোকচিত্রে শহিদুল আলমের কাজ তাঁকে শুধু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরিচিত করেনি, বাংলাদেশকেও গৌরবান্বিত করেছে। এ রকম একজন মানুষকে বিতর্কিত ৫৭ ধারায় কারাগারে আটক রাখার কোনো যুক্তি আছে বলে মনে করি না।অতএব যত দ্রুত সম্ভব শহিদুল আলমকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। তাতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনামই বাড়বে।

About banglamail

Check Also

বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন, তবে জামিন হ​য় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে !

সালেহা বেগম তাঁর ছেলের বউ রাবেয়া খাতুনকে জড়িয়ে ধরে নির্বাক রইলেন। তখন দুজনের চোখ দিয়ে …