Wednesday , October 24 2018
Home / রম্যরচনা / সংবাদ সম্মেলনে চোখে পেঁয়াজ ডলে কাঁদার চেষ্টা করলেন শাহজাহান খান !

সংবাদ সম্মেলনে চোখে পেঁয়াজ ডলে কাঁদার চেষ্টা করলেন শাহজাহান খান !

গোল টেবিল বৈঠক হচ্ছে মন্ত্রীদের নিয়ে। উপস্থিত আছেন প্রধানমন্ত্রী, মতিয়া চৌধুরি, আবুল মাল আব্দুল মুহিত, নুরুল ইসলাম নাহিদ, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, ওবায়দুল কাদের, হাসানুল হক ইনু, শাজাহান খান, জাবালে নূরের মালিক জাকির হোসেন এবং ছাত্রলীগের সভাপতি।

প্রধান মন্ত্রী প্রথম প্রশ্ন করলেন শাহজাহান খান কে, “আপনি ওরকম হাসছিলেন কেন?”

শাজাহান খান হাসি হাসি মুখ করে বললেন, “আসলে ম্যাডাম আগের রাতে ফেসবুকে দেখা একটা ট্রল মনে পড়ে গিয়েছিল তো! খুবই মজার ছিল, নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারিনি!”

প্রধানমন্ত্রী কিছু বলার আগেই ইনু সাহেব বললেন, “কিসের ট্রল ছিল ভায়া? আঠেরো প্লাস না কি?”
শাজাহান খান মিটমিট করে হাসতে হাসতে মাথা দোলালেন।

প্রধানমন্ত্রী রক্তচক্ষু নিয়ে ইনু সাহেবের দিকে তাকালেন, বললেন, “আজকে মিটিং শেষে আপনি আধ ঘন্টার জন্য নিল ডাউন হয়ে থাকবেন।” ইনু সাহেবের হাসি মিলিয়ে গেল, আস্তে আস্তে মাথা উপর নিচ করলো শুধু।

প্রধানমন্ত্রী আবার শাজাহান খান কে জিজ্ঞাসা করলেন, “আর আপনাকে ভারতের সাথে তুলনা দিতে বললো কে?”

“ম্যাডাম ওটা একটু যুক্তিবিদ্যা জাহির করলাম আরকি! আর তাছাড়া ভারত তো আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র, মা বলতো সবসময় নিজের বন্ধুর সাথে নিজেকে তুলনা করবি, তাই আর কি…”

“চুপ করুন।” প্রধানমন্ত্রী নিজেকে শান্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, “আপনারা কোনো বুদ্ধি দিন এই ক্ষিপ্ত ছাত্র জনতা কে শান্ত করার।”

মতিয়া চৌধুরী চট করে সমাধান দিলেন, “সবকটাকে রাজাকারের বাচ্চা বানিয়ে দেই! ওরা তো আর মুক্তিযুদ্ধ করেনাই! সহজেই রাজাকার-জামাত-শিবির প্রমাণ করা যাবে। তাহলে আর ভাবতে হবে না…”

মতিয়া চৌধুরির কথা শেষ না হতেই ছাত্রলীগ সভাপতি বত্রিশ দাঁতের হাসি দিয়ে বললেন, “তাহলে আমাদের সোনার ছেলেরা হাতুড়ি পিটিয়ে সোজা করে দেবে।”

মতিয়া চৌধুরি আর সভাপতি সাহেব তৃপ্তির হাসি নিয়ে তাকালেন প্রধানমন্ত্রীর দিকে, এতো সুন্দর সমাধানে তার প্রতিক্রিয়া কি দেখার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী চোখ কটমট করে তাকিয়ে বললেন, “এতো ফটর ফটর করবেন না।” দুজনই ফাঁটা বেলুনের মতো চুপসে গেলেন।

এই সুযোগে ওবায়দুল কাদের থেমে থেমে বললেন, “আমরা…মানে আমি… সব… আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের…বলেছি…বাসায় গিয়ে…তোমরা…লেখাপড়া করো…! ওরা সবাই…বাসায়…গিয়ে পড়তে…বসবে…নইলে…নাহিদ সাহেব…সবাইকে ফেল করিয়ে দেবেন…!”

প্রধানমন্ত্রী কিছুই বললেন না এবার, কাদেরের দিকে রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে রইলেন।

আবুল মাল আব্দুল মুহিত বললেন, “এক্সিডেন্ট এর উপর ১৫% ভ্যাট বসালেই হয়! ভয়ে কেউ এক্সিডেন্ট করবেনা!”

প্রধানমন্ত্রী এবার মুখ খুলতে বাধ্য হলেন, “চুপ করুন। যত্তসব রাবিশ!”

ইনু সুযোগ মতো একটু পাম দেয়ার চেষ্টা করলেন, “ম্যাডাম আপনি কিন্তু মাল সাহেবের চেয়েও সুন্দর করে রাবিশ বলেন!”

“আপনি কান ধরে নিল ডাউন হবেন।” ইনু কে জানিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী।

মহিউদ্দিন খান আলমগীর বললেন, “আমি কি কিছু বলতে পারি?”

“হ্যা বলুন, আপনিই শুধু বাকি আছেন।” দাঁত কিড়মিড় করে বললেন প্রধানমন্ত্রী।

ইনু সাহেব বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারলেন না, বললেন, “না ম্যাডাম, নাহিদ সাহেব কিছু বলেননি এখনও।”

নুরুল ইসলাম নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি আর কি বলবো? বলার আগেই তো সব ফাঁস হয়ে গেল!”

প্রধানমন্ত্রী ইনু কে চোখ দিয়ে ভস্ম করে দিতে চাইলেন, না পেরে মহিউদ্দিন কে বললেন, “বলুন কি বলবেন।”

“এই এক্সিডেন্ট বিরোধি দলীয় চক্রান্ত, বাস অন্যদিকে যাচ্ছিল বিএনপি এর নেতাকর্মীরা বাস ঠেলে শিক্ষার্থীদের উপরে তুলে দিয়েছে, এরকম বিবৃতি দিলে হয় না?” হাসি মুখে বললেন মহিউদ্দিন খান আলমগির।

প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাবালে নূরের মালিকের দিকে তাকালেন, “আপনি না কি ক্ষতিপূরণ দিতে চাচ্ছেন না?”

জাকির হোসেন মুখ কালো করে বললেন, “অতোটাকা কোথায় পাবো বলুন ম্যাডাম? এমনিতেই দুলাভাই কে দিতে হয়েছে, একে ওকে দিয়ে ব্যাপারটাকে বাগে আনার চেষ্টা করতে হয়েছে। এই যে দশহাজার করে দেব তাও তো ডান কিডনিটা বিক্রি করে দিতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী বিস্মিত হয়ে শাহজাহান খানের দিকে তাকালেন, “আপনি টাকা আপনার শ্যালকের থেকে নিয়েছেন?”

শাজাহান খান হাতের তালু ঘষতে ঘষতে বলেন, “কি করবো বলুন ম্যাডাম… ব্যবসায় তো আর আত্মীয় স্বজন দেখা যায় না… আর এইসব আর্থিক লেনদেন নগদ না হলে আবার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়।” ক্রমাগত হাতের তালু ঘষে যাচ্ছেন শাজাহান খান, যেন চামড়া তুলে ফেলবেন। মুখ হাসি হাসি। ইনু সাহেবের দম বন্ধ লাগছিল, “খান সাহেব বলুন না কি ট্রল দেখেছিলেন…”

“আপনি এখনই কান ধরে নিল ডাউন হোন,” ইনুর দিকে তাকিয়ে প্রধানমন্ত্রী হুঙ্কার ছাড়েন, তারপর বলেন, “আমি মাদার অফ হিউম্যানিটি পেয়েছি, মাদার অফ এডুকেশন পেয়েছি, আপনাদের জন্য মাদার অফ এক্সিডেন্টও পেতে হবে না কি? এ কেমন মন্ত্রীসভার আমার? আপনাদের সাথে চিংড়ি মাছের কোনো পার্থক্য নেই।”

আবুল মাল বললেন, “কেন? আমাদের দাম বেশি তাই?”

“না আপনাদেরও মাথা ভর্তি গু, তাই।” বললেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী উদাস চোখ সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “আওয়ামি লীগ আর আমার ইমেজ আর বাঁচাতে দিল না এরা। সংবর্ধনা পেলাম, সব কিছুর মা হয়ে উঠলাম, এতো সুন্দর করে সব গুছিয়ে আনলাম, আরেকটা সুষ্ঠু নির্বাচন এর পর সরকার বানাতে পারার আগেই এদের জন্য সব ভেস্তে যাবে….”

প্রধানমন্ত্রীকে বিড়বিড় করতে দেখে মতিয়া চৌধুরী বললেন, “কি বলছেন?”

প্রধানমন্ত্রী উদাস হয়ে গেলেন, “কি আর বলবো! আমি তো ভয়ে ঘুমাতে পারি না এখন। অল্প কিছু লোক জড় হলেই ভয় লাগে। ছাত্রলীগ দিনদিন হাতুড়ি লীগ হয়ে উঠছে। আমি মাদার অফ এডুকেশন থেকে মাদার অফ করাপশন হয়ে উঠছি। সব কেমন জানি চিচিং ফাঁক হয়ে ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। জয় স্যাটেলাইট থেকে হিসাব করে জানিয়েছে ভবিষ্যত অন্ধকার…”

শাজাহান খান এই ফাঁকে একটু ফেসবুকে ঢুকেছিলেন, হঠাৎ কি একটা দেখে প্রধানমন্ত্রী কে বললেন, “ম্যাডাম জয় বাবা কি বলেছে দেখুন, স্যাটেলাইট থেকে নাকি তিনি আন্দোলন দেখছেন, তিনি ভাবতেই পারেননি ছেলেরা এতো ভয়ংকর হতে পারে!”

প্রধানমন্ত্রীর মুখ তেতো হয়ে গেল, “ছাগল” বলে উঠলেন তিনি!

শাজাহান খান বুঝলেন না ছাগলটা কে।

এইসময় পুলিশের আইজি ফোন দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চাইলেন, প্রধানমন্ত্রী ফোন ধরলে বললেন, “ম্যাডাম আমি আমার পরিচয় ভুলে গেছি।”

“মানে?!” প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন শুনে অবাক।

“মানে ম্যাডাম আমি পুলিশ না চ্যাটের বাল সেইটা বুঝতেছি না!” কাচুমাচু হয়ে বললেন আইজি।

“শাট আপ।” বলে ফোন রেখে দিলেন প্রধানমন্ত্রী। মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেছে।

তখন হঠাৎই আইন মন্ত্রী আনিসুল হকের ফোন এলো। তিনি লাস ভেগাসে গিয়ে আইনি জটিলতায় পড়ে আসতে পারেননি। তার সাথে ফোনে কথা বলার পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ উজ্জল হয়ে উঠলো। ‘আহা! ঘোর অন্ধকারে সমুদ্রে পেলাম যেন লাইট হাউসের আলো’ আওড়ালেন প্রধানমন্ত্রী। “ম্যাডাম কবিতাটা কিন্তু দুর্দান্ত..” নিল ডাউন অবস্থাতেই একটু পাম মারলেন ইনু। প্রধান মন্ত্রী এবার রাগলেন না, হাসি মুখে বললেন, “উঠে আসুন, চেয়ারে বসুন।”

“আনিসুল সাহেব কি বললেন?” হাসতে হাসতেই জিজ্ঞাসা করলেন শাজাহান খান।

“আমরা সংবাদ সম্মেলনে বলবো আমরা একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি, ওরকম নাজুক মুহূর্তে শাজাহান খান হাসছিলেন কেন তা তদন্ত করার জন্য। তখন টিয়ার শেল ছোড়ার কথা ছিল যেন উনি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। কিন্তু জামাত শিবিরের চক্রান্তে কেউ লাফিং গ্যাস ছেড়ে দেয়ায় এই দুরাবস্থা হয়েছে। শাজাহান খানের লজ্জা না থাকায় আওয়ামি লীগ সেই কাজা লজ্জা আদায় করে দেবে।”

“জিনিয়াস! পিওর জিনিয়াস!” বলে হাততালি দিলেন নাহিদ।

“জিনিয়াস হবে না? উনি তো আপনার আমলে ফাঁসকরা প্রশ্নে পাস করেননি!” বললেন প্রধান মন্ত্রী।

“আমার কি হবে?” এতোক্ষণ চুপ থেকে বললেন জাকির হোসেন।

“কদিন যাক… আবার বাস… নামাবেন… কিন্তু… অন্য নামে… নাম ঠিক… করুন…” থেমে থেমে বললেন ওবায়দুল কাদের।

“ফেসবুকে আমি সুন্দর একটা নাম দেখেছি। ওটাই দিও।” হাসতে হাসতে শ্যালককে বললেন শাজাহান খান।
“কি?”
“আবালে নূর…”

প্রধানমন্ত্রী আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “চিংড়ি মাছের মাথায় গু থাকলেও তা রপ্তানি করা যায়, এদের তাও করা যাচ্ছে না…”

পরেরদিন সংবাদ সম্মেলনে চোখে পেঁয়াজ ডলে যখন শাজাহান খান কাঁদো কাঁদো মুখে সব তথ্য জানাচ্ছিলেন তখন তুমুল বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে বাবা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, যাতে লেখা সন্তান হত্যার বিচার চাই।

মিরপুর চৌদ্দ তে তখন শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের ছেলেদের পুলিশের লোকেরা শাসাচ্ছে, “আমাদের স্কুলে পড়ে আন্দোলন? সবাইকে বহিস্কার করে দেব!” এই কলেজের একজন আইসিইউ তে ভর্তি।

দনিয়ায় আন্দোলনকারির উপর দিয়ে ট্রাক উঠে গেল। এক পাগল ওই দৃশ্য দেখলো না, ও দেখলো লাল সবুজের উপর হায়েনার ট্রাক উঠে গেল।

মধুমিতা হলে বাস যখন নতুন সিনেমা দেখার আশায় ঢুকে পড়লো প্রধানমন্ত্রী তখন এটাকে উদাহরণ দেখিয়ে জানালেন, তিনি জাবালে নূরে চড়ে চাঁদে যেতে চান।

সন্ধ্যা বেলা প্ল্যাকার্ডধারি পিতার সামনে এক কালো মাইক্রোবাস থামলো। দশহাজার টাকার একটা বান্ডেল ছুড়ে দিল তার দিকে আর অচেনা কেউ বলে গেল, “মামা যাও গা, মাইয়ার কুলখানি করো। আমাগোরেও দাওয়াত দিও কিন্তু।”

রম্যরচনা
ফুয়াদ

About banglamail

Check Also

বাস চলাচল আপনাদের পছন্দ না হলে বাসই বন্ধ করে দেই ? – প্রধানমন্ত্রী

৫ টাকায় বাসে চড়ার সুযোগ করে দিছি, ছাত্রদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যাবস্থা করে দিছি। তারপরেও …