ইহুদীরা যেভাবে ফিলিস্তিনের ভুখন্ডকে কব্জা করে নিলো – আলী আহমাদ মাবরুর

ইউরোপ থেকে আগত জাতীয়তাবাদের চেতনার ভিত্তিতে আরব অঞ্চলকে বিভিন্ন দেশে ভাগ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যাটির সৃষ্টি হয় ফিলিস্তিনকে নিয়ে। যার অনেকটুকু অংশ নিয়েই পরবর্তীতে জোর করে ইসরাইল রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং এর পরপর, নাৎসীরা ইহুদীদের বিরুদ্ধে ব্যপক গনহত্যা চালায়। সেই গনহত্যার আতংক থেকে বাঁচার জন্য ইহুদীদের জন্য পৃথক আবাসভুমি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। ইউরোপের মধ্যে কেবলমাত্র যে নাৎসীরাই শুধু ইহুদীদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ড চালিয়েছে তা নয়।

ইতালীতেও ইহুদীদের বিরুদ্ধে ব্যপক নিপীড়ন চালানো হয়। ফ্রান্সেও জার্মানীর যে পুতুল সরকার ছিল তারাও ইহুদীদের উপর নির্যাতন শুরু করে। বৃটেন, স্পেন বা বেলজিয়াম কোন দেশই আসলে ইহুদীদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে চতুর্দিক থেকে নিপীড়নের মুখে লক্ষ লক্ষ ইহুদী ইউরোপের বিভিন্নস্থানে আটকা পড়ে। তারা নিরাপত্তার সন্ধানে যে যেদিকে পারে ছুটে যায়। উম্মুক্ত সাগরে নৌকা নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবেও যাত্রা শুরু করে। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ইহুদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌছতে সক্ষম হয় এবং সেখানেই তারা বসতি গড়ে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তো নিজস্ব নাগরিক আছে। তারা আর কতজন ইহুদী অভিবাসীকে আশ্রয় দিতে পারবে। ফলে তারা ইহুদী অভিবাসীদের জন্য কোটা নির্ধারন করে। মার্কিনীদের মধ্যেও সেই সময় ইহুদী বিরোধী চেতনার লক্ষন পাওয়া যায়।

এই পালিয়ে যাওয়া ইহুদীরা একটিমাত্র জায়গাতেই যেতে পারতো, যার নাম ফিলিস্তিন। কেননা বিংশ শতকের গনহত্যা শুরু হওয়ার বহু শতক আগে যেই ইহুদীরা ফিলিস্তিনে গিয়েছিল তারা সেখানে বেশ স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ছিল। তারা জমি কিনে সেখানেই স্থায়ী ছিল। কিছু অবকাঠামো নির্মান করেছিল। তাই ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে নতুনভাবে যেই ইহুদীরা বিপদে পড়লো তাদের বেশীরভাগই সেই পথেই অগ্রসর হলো। তাছাড়া তারা এটা বিশ্বাস করতো যে ফিলিস্তিনে বহু শতাব্দী আগেও তাদের পূর্বপুরুষেরা বসবাস করতো। তাই ফিলিস্তিনের ব্যপারে তারা ভিন্ন রকম দাবীও অনুভব করতো।

কিন্তু ইহুদীরা ফিলিস্তিনের ব্যপারে যেই দাবী করেছিল এটা সেখানকার আরবেরা মানতে পারেনি কখনোই। কিন্তু ফিলিস্তিনের আরবেরা অনেকটা অসহায় ছিল কেননা তারা দুই স্তরের বহি:শত্রুদের আধিপত্যের কারনে কোনঠাসা অবস্থায় ছিল। তাদের প্রথম স্তরের নির্ধারক ছিলেন তুর্কীরা আর দ্বিতীয় স্তরের নির্ধারক ছিলেন ইউরোপীয় কর্তৃত্বশালীরা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মুলত নদীর স্রোতের মত ইহুদী অভিবাসীরা ফিলিস্তিনে যেতে শুরু করে।

নতুন ইউরোপীয়ান অভিবাসীরা অবশ্য জোর করে কোন জমি দখল করেনি। তারা যেখানে বসতি গড়লেন সেখানে তারা মুলত জমি কিনতে শুরু করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা প্রাথমিকভাবে এমন জমিগুলোকে কিনেন যেগুলোর কোন মালিক সেই মুহুর্তে উপস্থিত ছিলেন না। তাই এই জমিগুলো নিয়েই শুরু থেকেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনে তাই হয়েছে যা ইতোপূর্বে আলজেরিয়াতে হয়েছিল। আলজেরিয়াতেও ফরাসী অভিবাসীরা জমি কিনেছিল এবং পরবর্তীতে তারা আলজেরিয়ানদের পাশাপাশি নিজেদের মত করে আরেকটি অর্থনীতিও চালু করেছিল। ফলে একটা সময়ে গিয়ে আলজেরিয়ার সত্যিকারের বাসিন্দারা নিজদেশেই পরবাসী হয়ে যায়।

ঠিক একইভাবে ১৯৪৫ সালের দিকে এসে, এত সংখ্যক ইহুদীরা ইউরোপের নানা অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনে এসে জমা হয় যে তাদের সংখ্যা মুল ফিলিস্তিনী আরবদের সংখ্যার প্রায় সমান হয়ে যায়। সংখ্যার বিচারে বলা যায় মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে ফিলিস্তিনে প্রায় কোটিখানেক ইহুদী এসে আশ্রয় নেয়। সমস্যা তো তাহলে হবেই। এটা অনেকটা অবধারিতই ছিল।

বর্তমান বাস্তবতায় যদি বলি, জনসংখ্যার বিচারে জেরুজালেম এখন অনেকটাই ইহুদীদের দখলে। জেরুজালেমের মোট জনসংখ্যার ৪০ ভাগ হলো মুসলমান ও খৃষ্টান অার বাকি ৬০ ভাগই হলো ইহুদী। ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলের সংসদ ভবন, মন্ত্রীসভার অফিস, অধিকাংশ মন্ত্রীর বাসভবন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের সরকারী বাসভবন, ইসরাইলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ন স্থাপনার অধিকাংশই এই জেরুজালেমে। তাই জেরুজালেমকে নিজেদের মত করে দাবী করার সাহস ইসরাইল করতে পেয়েছে। আর আমেরিকা জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরাইলের স্বপ্ন পূরনের পথকে আরও উম্মুক্ত করে দিয়েছে।

Comments Us On Facebook: