সোনাগাজী বক্তারমুন্সী কলেজ অধ্যক্ষ আইন না মেনে সপদে বহাল তবিয়তে

আবদুল্লাহ রিয়েল,ফেনী প্রতিনিধি: সোনাগাজী উপজেলার বক্তারমুন্সী শেখ শহীদুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশ অমান্য করে সপদে বহাল থাকার অভিযোগ ওঠেছে। শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে দুজন শিক্ষকের ওপর হামলাসহ অনিয়মের অভিযোগ।

কলেজ সূত্র জানায়, গত ১৯ আগস্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক ড. মো. মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত ও কলেজ পরিচালনা পরিষদ সভাপতি বরাবরে প্রেরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘কলেজের অধ্যক্ষ মোমিনুল ইসলামের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে গত ১ অক্টোবর। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক উপাধ্যক্ষ অথবা জ্যেষ্ঠতম শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে অবহিত করতে আপনাকে অনুরোধ করা হল।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের (ভিসি) আদেশক্রমে চিঠিটি পাঠানো হয় বলে এতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ওই চিঠির প্রায় সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হলেও অধ্যক্ষ সপদে বহাল আছেন এবং নিজ স্বাক্ষরে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও লেনদেন করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, অধ্যক্ষের নানা অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ২৫ অক্টোবর কলেজের জ্যেষ্ঠতম ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মো. মজিবুর রহমানের ওপর হামলা করে কতিপয় বহিরাগত যুবক।

ওই সময় তিনি এ ঘটনার জন্য অধ্যক্ষকে দায়ী করলেও মান-সম্মান হারানোর ভয়ে থানায় কোনো অভিযোগ দেননি। পরদিন অধ্যক্ষের অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আলমগীর হোসেনকে অধ্যক্ষ গলা টিপে ধরেন। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে তাঁকে উদ্ধার করেন। সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কলেজের অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণসহ নানা অভিযোগে তৎকালীন ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন মুন্সী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

ওই কমিটি তদন্তকালে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পায়। বিশেষ করে বিভিন্ন মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে রসিদ দেখাতে পারলেও সেই সময় অধ্যক্ষ বাস্তবে ওইসব মালামাল দেখাতে ব্যর্থ হন। তখন ওই তদন্ত কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে অধ্যক্ষকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে ফেনী-৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা প্রয়াত মোশাররফ হোসেনের মাধ্যমে তিনি আবার সপদে বহাল হন।

জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে তিনি এ কলেজে উপাধ্যক্ষ পদে যোগদান করেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৮২-৮৩ সালে শাহ আমানত হল ছাত্রশিবিরের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। তবে শিক্ষকতা পেশায় আসার পর তাঁকে আর জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে পাওয়া যায়নি। কিন্তু ফেনীতে জামায়াত পরিচালিত আল কেমী হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির সিংহভাগ অংশীদার জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত। সম্প্রতি কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, কলেজের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই ভবনের দরজা-জানালা প্রায় সবই ভেঙে গেছে। জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে ভবনটি। মাত্র তিন বছরে কীভাবে এ ভবনের এই জীর্ণদশা হল-সেই ব্যাপারে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ভবনের দুরবস্থা দেখে ব্যথিত অনুদানদাতা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই। সোনাগাজীর নবাবপুর এলাকার এই বাসিন্দা ঢাকায় বসবাস করেন। সোনাগাজীর বিভিন্ন এলাকায় নানা ক্ষেত্রে-বিশেষ করে শিক্ষার প্রসারে অনুদান দিয়ে থাকেন তিনি। সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি অনুদানের টাকায় স্কুল-কলেজের ভবন নির্মিত হলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। তারা পড়াশোনা শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু যখন দেখি অনুদানের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হয় না, তখন আমরা খুব কষ্ট পাই। ’ ২০০৪ সালে অধ্যক্ষের অনিয়ম তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির একজন সদস্য অধ্যাপক রফিক রহমান ভূঁঞা। তিনি ওই সময় ফেনী সরকারি কলেজ বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বক্তারমুন্সী কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ওই সময় অধ্যক্ষের বেশকিছু অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য পেয়েছিলেন বলে এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেনে। তিনি বলেন, ‘বেশকিছু মালামালের রশিদ পেলেও আমরা স্টকে ওইসব মালামাল পাইনি। ’ কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মুজিবুর রহমান ২৫ অক্টোবর তাঁর ওপর বহিরাগত যুবকদের হামলার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আসলে লোক-লজ্জার ভয়ে বিষয়টি প্রকাশ করিনি। তবে প্রতিবাদ করেছি। শিক্ষকরাও এর প্রতিবাদ করেছেন। ’ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-কলেজ পরিদর্শক (ডেপুটি ইন্সপেক্টর অব কলেজ) হাসান আমীর সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিঠি প্রেরণের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আসলে বয়সসীমা শেষ হওয়ায় এখন আর অধ্যক্ষের ওই পদে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাই ভিসি মহোদয়ের আদেশে ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে। ’ কলেজের নানা অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ দিলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। ’ এদিকে ২৩ বছর আগে তৎকালীন উপাধ্যক্ষ মোমিনুল ইসলাম অধ্যক্ষ পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর আর উপাধ্যক্ষ নিয়োগ হয়নি। কলেজ পরিচালনা পরিষদ সভাপতি ও ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য রহিম উল্যাহ ২২ অক্টোবর এক চিঠিতে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মজিবুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিলেও তা কার্যকর হয়নি। এ ব্যাপারে রহিম উল্যাহ বলেন, ‘অধ্যক্ষের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ায় তিনি আর ওই পদে থাকতে পারবেন না। তাই একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়। ’
এসব বিষয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি বেশির ভাগ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। দুর্নীতি-অনিয়ম প্রসঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। অভিযোগকে তিনি বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেন।

Comments Us On Facebook: