তারেক রহমান তার জ্যাকেটটি খুলে শীতার্ত শহিদুলকে পরিয়ে দিলেন – সাইফুর রহমান

একজন মানুষের বিখ্যাত হয়ে ওঠার আগে ও পরে সেই মানুষটিকে ঘিরে কীভাবে পরস্পরবিরোধী মিথ তৈরি হয় তার একটি জাজ্বল্যমান উদাহরণ দিচ্ছি। নেলসন ম্যান্ডেলা জন্মগ্রহণ করেন দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সকেই অঞ্চলের মভেজো নামক গ্রামে ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই। তিনি জন্মেছিলেন রাজকীয় থেম্বু গোত্রে। ম্যান্ডেলার পিতা হেনরি ছিলেন থেম্বু রাজা জোঙ্গিনতাবার একজন মন্ত্রী। ম্যান্ডেলার বয়স যখন সবেমাত্র ৯ বছর তখন তার পিতা হেনরি ইহলোক ত্যাগ করেন। পিতার মৃত্যুর পর রাজা জোঙ্গিনতাবা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নেন ম্যান্ডেলার। পড়াশোনার জন্য তাকে পাঠানো হয় স্বনামধন্য মিশনারি স্কুল হেল্ডটাউনে। সেখানে ওয়েলিংটন নামের এক ব্রিটিশ শিক্ষক তার নাম দেন বিশিষ্ট ব্রিটিশ নৌ এডমিরাল নেলসনের নামে। নেলসন হলো সেই নৌ সমরবিদ যিনি যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন নেপোলিয়নকে। আর এভাবেই ম্যান্ডেলা নামক নামটির আগে যুক্ত হয় নেলসন নামটি। হেল্ডটাউনের পাঠ চুকে গেলে ম্যান্ডেলা ভর্তি হন ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সেখানে পড়াশোনা শুরু করেন আইনে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বহিষ্কার হন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বহিষ্কার হয়ে ফিরে আসেন নিজ গ্রাম মভেজোতে। সেখানে ফিরে তিনি জানতে পারলেন রাজা জোঙ্গিনতাবা তার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। এমন এক মেয়ের সঙ্গে যে মেয়ে ভালোবাসে পূর্ববর্তী রাজার ছেলে জাস্টিসকে।
তিনি কিছুতেই বিয়ে করবেন না এই মেয়েকে। বুদ্ধি আঁটতে লাগলেন কী করা যায়। একবার ভাবলেন চলে যাবেন জোহানেসবার্গ। কিন্তু সেখানে যেতেও তো কিছু অর্থের প্রয়োজন। সঙ্গে একজন বন্ধু জুটিয়ে রাজা জোঙ্গিনতাবার গোশালা থেকে একটি গরু চুরি করে পালিয়ে গেলেন জোহানেসবার্গে। পালিয়ে তো এলেন কিন্তু দিন চালাবেন কীভাবে। গরু চুরির টাকায় আর কদিন চলে। ক্রাউন নামের একটি খনির প্রহরী হিসেবে কাজ করলেন কিছু দিন। পরে থেম্বু রাজা জোঙ্গিনতাবার সঙ্গে রফাদফা হলো। রাজা ম্যান্ডেলাকে বললেন— বিয়ে করনি ঠিক আছে কিন্তু আগে পড়াশোনাটা শেষ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব না হওয়ায় দুরশিক্ষণের মাধ্যমেই শেষ করলেন আইন পাঠ। এরপর উইটকিন, সিডেলস্কাই অ্যান্ড এডেলম্যান নামক একটি ল’ফার্মে ঢুকলেন জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে। কাজ করতে গিয়ে অচিরেই ফার্মের প্রভাবশালী অংশীদার লেজার সিডেলস্কাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল ম্যান্ডেলার। সিডেলস্কাই ম্যান্ডেলাকে উপদেশ দিলেন আইনে আরও উচ্চতর ডিগ্রি নিতে। এরই ধারাবাহিকতায় ম্যান্ডেলা ভর্তি হলেন উইট ওয়াটার সিরান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি অ্যাডভোকেট হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিলেন একবার-দুবার নয়, তিন-তিনবার। ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাডভোকেট হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করা ছিল ব্রিটেনে ব্যারিস্টার হওয়ার সমমর্যাদার। চতুর্থবার পরীক্ষায় বসার জন্য প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ম্যান্ডেলা জানতে পারলেন পরীক্ষা দিতে পারবেন না তিনি। কী আর করা, অ্যাডভোকেট না হতে পেরে আর একধাপ নিচের অ্যাটর্নি হওয়ার পরীক্ষায় বসে পাস করলেন। অ্যাটর্নিশিপ হচ্ছে ব্রিটেনের সলিসিটর হওয়ার সমপর্যায়ের।

অ্যাটর্নি হওয়ার পর তার এক বন্ধু অলিভার থেম্বোকে সঙ্গে নিয়ে এবার নিজেই খুললেন একটি ল’ফার্ম। এ পর্যন্ত সবকিছুই ছিল ঠিকঠাক। ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কিংবা অনুযোগ কিছু নেই কারও। কিন্তু আজীবন বন্ধু অলিভার থেম্বো ও ওয়াল্টার সিসুলুর প্ররোচনায় ম্যান্ডেলা প্রবেশ করলেন রাজনীতিতে। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুব সংগঠনের একজন সক্রিয় নেতা হিসেবে তিনি রাজনীতি শুরু করলেন ১৯৪৪ সালে। ১৯৪৮ সালে নির্বাচনে ক্ষমতায় এলো হার্ডলাইন ন্যাশনাল পার্টি। দলটি ক্ষমতায় এসেই শুরু করল জাতিগত ও বর্ণবৈষম্যমূলক অত্যাচার ও কর্মকাণ্ড। সেই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন। ম্যান্ডেলাও জোরালোভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে লাগলেন রাজনীতিতে। ধীরে ধীরে তিনি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগলেন আফ্রিকার কালো মানুষদের কাছে। শ্বেতাঙ্গরা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারল জনপ্রিয়তার দিক থেকে ম্যান্ডেলা যেভাবে সবাইকে পেছনে ফেলে সামনে এগোচ্ছেন তাতে করে তাকে থামানোটা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠবে। আর এ জন্যই তার বিরুদ্ধে শুরু হলো মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। পত্রপত্রিকাগুলোও তার পেছনে উঠেপড়ে লাগল। সে সময় সানডে টাইমস কিংবা দ্য হেরল্ড ইত্যাদি পত্রিকার পাতাগুলো খুললেই দেখা যেত তার সম্পর্কে যথেচ্ছা মিথ্যাচার, কুৎসা ও কদার্যে ভরা সব প্রতিবেদন। যেমন— পরকীয়া এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার জন্য তার স্ত্রী এভিলিন তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। ম্যান্ডেলা গরু চুরি করে পালিয়ে গিয়েছিলেন। অ্যাডভোকেটশিপ পরীক্ষায় কৃতকার্য না হয়েও কীভাবে তিনি আইন প্র্যাকটিস করছেন ইত্যাদি। যাবতীয় কেচ্ছাকাহিনী ছাপা হতে লাগল সরকার দলের নিয়ন্ত্রিত পত্রপত্রিকাগুলোতে। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্যই ছিল যেভাবে হোক নেলসন ম্যান্ডেলাকে বিতাড়িত করতে হবে রাজনীতি থেকে।

১৯৫২ সালে তার বিরুদ্ধে করা হলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা। এরপরের ঘটনাগুলো সবারই জানা। ১৯৬৩ সালে তাকে পাঠানো হলো রুবেন আইল্যান্ড নামক একটি জেলখানায়। সেখানে তিনি কারাবাসে ছিলেন দীর্ঘ ২৭ বছর। তার লিডারশিপের পরস্ফুিটন কিন্তু ঘটে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর। বিশেষ করে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করেন যখন তিনি নির্বাচনে নিরঙ্কুষ বিজয় লাভ করার পরও যারা তাকে ২৭ বছর কারাভোগ করিয়েছিলেন তাদেরই একজন ডি ক্লার্ককে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন। চমকে দেওয়ার মতো এমন আরও শত দৃষ্টান্ত আছে যা কিনা ম্যান্ডেলা-গান্ধী ও আব্রাহাম লিংকনের পদাঙ্ক অনুসরণের মাধ্যমে সেগুলো করে দেখিয়েছিলেন। যা পরে কোনো দিন বিস্তারিত আলোচনা করব। এখন তারেক রহমানের প্রসঙ্গে আসি। পাঠকবৃন্দ আপনারা কিন্তু ভুলেও এটি ভাববেন না যে, আমি ম্যান্ডেলার সঙ্গে তারেক রহমানের তুলনা করছি। আমি শুধু একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখালাম যে, একজন নেতাকে দাবিয়ে রাখার জন্য শাসকগোষ্ঠী কতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করতে পারে। তারেক রহমানের কিছু কিছু দিক আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। যেমন— বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ যখন রাজনীতিতে প্রথম প্রবেশ করেন তখন তারেক রহমান তাকে ফুল ও মিষ্টি পাঠিয়ে শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানিয়েছিলেন। ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে চ্যানেল আইকে দেওয়া তারেক রহমান তার জীবনের প্রথম টিভি সাক্ষাৎকারে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ জিয়াউর রহমানকে সঠিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে এবং অতীতের সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আমরা যদি একসঙ্গে কাজ করি তাহলে নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ে তুলতে পারব। তারেক রহমান শুধু বঙ্গবন্ধুর যথাযথ মূল্যায়নের কথাই বলেননি, তিনি ২০০৪ সালের জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারি মাসে, গোপালগঞ্জ স্টেডিয়ামে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের একটি অনুষ্ঠান শেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করেছিলেন। আমাদের দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি বিরল ঘটনা। কারণ আওয়ামী লীগের কোনো একটি মধ্যম সারির নেতাও এরকম ঔদার্য দেখানোর যোগ্যতা রাখেন বলে আমার জানা নেই।

সম্ভবত ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাস হবে। এর কিছু দিন আগে আমি বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরেছি। আমার ধারণা সে সময় হাওয়া ভবনের তিনতলায় একটি ল’সেল খোলা হয়েছিল। আমি ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। জড়িত ছিলাম সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে। সে কারণেই বোধকরি আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ব্যারিস্টার মীর হেলাল এক সন্ধ্যায় আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তারেক রহমানের সঙ্গে। সন্ধ্যার পর তিন-চার মাস পালা করে বসতাম সেই ল-সেলটায়। যদিও তারেক রহমানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে জীবনে কদাচিৎ এবং যৎসামান্যই। কিন্তু তাকে কাছ থেকে দেখার ও পর্যবেক্ষণ করার যথেষ্ট অবকাশ ও সুযোগ আমার ঘটেছিল। এরকম সদাহাস্যোজ্জ্বল ও বন্ধুবৎসল মানুষ সমাজে সত্যি বিরল। আমি নিজ চোখে যা দেখেছি ও জেনেছি সেগুলোই আজ লিখছি। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত লেখক ফ্রান্স কাফ্কার একটি উক্তি মনে পড়ে গেল। নিজ আত্মার সঙ্গে প্রতারণা করে একজন লেখকের আদৌ কিছু লেখা উচিত নয়। বিখ্যাত আমেরিকান সাহিত্যিক উইলিয়াম ফকনার যেমন বলেছেন— একজন প্রকৃত লেখকের সব সময় সত্য ও সঠিক বিষয়বস্তু লেখা থেকে পিছু হটা কাপুরুষের লক্ষণ। সে হোক কটু কিংবা বিস্ময়কর। আমি তখন নতুন নতুন হাওয়া ভবনে যাতায়াত করি। অনুমান করি ফেব্রুয়ারি মাস-টাস হবে। একদিন রাত তখন ১১-১২টা। আমি আর হেলাল ফিরে যাচ্ছি বাসায়। বের হওয়ার সময় দেখলাম ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান। আরও দু-চারজনের সঙ্গে গল্প করছেন। শহিদুল নামে একটি ছেলে সে সময় হাওয়া ভবনে কাজ করত। ফটকের সামনে সেও দাঁড়িয়ে আছে ফটকটি খুলে দেওয়ার জন্য। তারেক রহমানকে গল্প করতে দেখে হেলাল ও আমি দুজনই সেই গল্পে যোগ দিলাম। তারেক রহমান হঠাৎ খেয়াল করলেন শহিদুলের শরীরে শুধু একটি শার্ট। রাত বেশি হওয়ায় বেচারা শীতে কাঁপছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারেক রহমান তাকে ধমক লাগালেন, কেন শীতের কাপড় পরে আসেনি। তিনি তার শরীরের জ্যাকেটটি খুলে শহিদুলকে দিয়ে বললেন, পরে নাও এটা। শহিদুল উসখুস করতে লাগল। তখন তারেক রহমান শহিদুলকে উদ্দেশ করে বললেন, আমি তো এক্ষুনি বাড়ি চলে যাচ্ছি। তোর তো এখানে থাকতে হবে, আরও ঘণ্টা দুয়েক। ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে। আর শোন কাল কিন্তু জ্যাকেটটি মনে করে আমাকে ফেরত দিয়ে দিস। এটা আমার অনেক পছন্দের জ্যাকেট। এই হলো তারেক রহমান। কেউ কেউ হাওয়া ভবন নিয়ে বিতর্ক তোলেন কিন্তু বাংলাদেশের অনেকেই হয়তো জানেন না, তারেক রহমান হাওয়া ভবনে একটি রিসার্চ সেল অর্থাৎ গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। যেখানে তথ্য থাকত বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে ধান ভালো হয়, কোন অঞ্চলটিতে পাট, সরিষা, গম, ভুট্টা ভালো জন্মে। বিশেষ করে কোন অঞ্চলের মাটি কোন ফসলের জন্য উপযুক্ত। এ ছাড়াও কোন অঞ্চলে কত শতাংশ মানুষ বেকার। কোন অঞ্চলে দরিদ্রতার হার বেশি। কোন জেলাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে ইত্যাদি।

এরকম আরও বহু নব নব উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। এতদিন পর আজ অনেক কিছুই মাথা থেকে বিস্মৃত হয়ে গেছে। এভাবে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। এ ধরনের কাজগুলোর সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত করেছিলেন বাংলাদেশের একঝাঁক তরুণ ও মেধাবী মানুষ। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ ও দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্র। যেমন— ব্যারিস্টার নওসাদ জমির, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, ডা. আমান, ব্যারিস্টার ওমর সাদাত, আতিকুর রহমান রুমন, রফিকুল ইসলাম বকুল, ব্যারিস্টার হেলালসহ আরও অনেকে। তিনি নিজেও পড়াশোনা করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠগুলোতে। মাধ্যমিক পর্যায়ে তারেক রহমান লেখাপড়া করেন রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে। উচ্চ মাধ্যমিক আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে এবং স্নাতক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুধু তাই নয়, তিনি সমস্ত বাংলাদেশ ঘুরে ঘুরে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখতে পারে এ ধরনের সৎ যোগ্য ও মেধাবী রাজনীতিবিদদের বিএনপিতে প্রবেশনের জন্য কাজ করেছিলেন। আমার বাড়ি পাবনা জেলায়। পাবনা থেকে তিনি দলে টেনেছিলেন উত্তরবঙ্গের প্রথিতযশা নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের মতো ব্যক্তিকে। যেসব মানুষ আজ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউর করে মুখে ফেনা তুলছেন তাদের উদ্দেশে বলছি— রাতারাতি কিংবা এক দিনে রাজনীতির উচ্চাসনে পৌঁছাননি তারেক রহমান। তৃণমূল পর্যায় থেকে সুদীর্ঘকাল রাজনীতি করে ২০০২ সালের ২২ জুন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতীয় কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত হন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। জেলায় জেলায় ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভার মাধ্যমে নিজেকে নিয়ে গেছেন গ্রামের দেহাতি মানুষের একেবারে কাছাকাছি। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে তিনি তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর তনয়রা যে কেমন হয় সেটা আমরা যারা ইতিহাস চর্চা করি তারা কম বেশি সবাই জানি। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজিব গান্ধীকে বাদ দিয়ে কনিষ্ঠ পুত্র সঞ্জয় গান্ধীকে নিয়ে আসেন রাজনীতিতে। ১৯৭৪ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর প্রকৃতপক্ষে দেশ চালাতেন সঞ্জয় গান্ধী। তিনি তখন হরহামেশাই কেবিনেট মন্ত্রীদের ধমকাতেন ও রূঢ় আচরণ করতেন। শুধু তাই নয়, সঞ্জয় গান্ধীর কথা না শোনার জন্য মন্ত্রী জয়প্রকাশ নারায়ণ ও জিভাটরাম কৃপালিনিকে বন্দী করে জেলে পাঠান। তার রূঢ় আচরণে প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ ও তথ্যমন্ত্রী আইকে গুজরাল পদত্যাগ করেছিলেন। সঞ্জয় গান্ধী এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন যে, একটি ঘরোয়া পার্টিতে তিনি তার মা ইন্দিরা গান্ধীকে চপেটাঘাত করেছিলেন। তাও একবার-দুবার নয় ছ’ছবার। সেই খবর ছাপা হয়েছিল ওয়াশিংটন টাইমস ও নিউইয়র্কার পত্রিকায়। আর এই নিউজটি করেছিলেন তৎকালীন পুলিত্জার পাওয়া আমেরিকার বিখ্যাত সাংবাদিক লুইস সিমন্স। আর এখন সৌদি যুবরাজ যে কী করছেন তা তো আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি।

অন্যদিকে তিন-তিনবার নির্বাচিত হওয়া প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হয়েও তারেক রহমান ছুটে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। তিনি ছিলেন কৃষকের প্রকৃত বন্ধু। ২০০৩ সালের ১৮ মে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অগ্রণী সেচ প্রকল্পটি দেখতে। সে সময় কৃষকদের মধ্যে তিনি বি-২৯ ধানের বীজ বিতরণ করেন। ২০০৪ সালে পাবনায় পেঁপে বাদশার পেঁপে বাগান পরিদর্শন করে তিনি বলেছিলেন— বাংলাদেশে বাদশার মতো মানুষ আরও বেশি বেশি প্রয়োজন। তিনি ছুটে গিয়েছিলেন মুক্তাগাছার কান্দিরগাঁও এলাকায়। সেখানে তারেক রহমান কৃষক নুরুল ইসলামকে বুকে জড়িয়ে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হয় দেশব্যাপী দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি। চলমান এ প্রকল্পের আওতায় ৩৮৬২টি পরিবারের মধ্যে উন্নতমানের ছাগল, হাঁস-মুরগি বিতরণ করা হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের গাজীর বাজারে এক বিশাল জনসভায় তারেক রহমান যে ভাষণটি দিয়েছিলেন সেটি ছিল বেশ প্রণিধানযোগ্য। জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশ ও জাতির উন্নয়নে কোনো মতপার্থক্য থাকা উচিত নয়। ৩২ বছর ধরে বিতর্ক করে অনেক সময় নষ্ট করেছি। এখন আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। যার যার অবস্থান থেকে দেশ সেবায় ব্রতী হতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতি ইঞ্চি সদ্ব্যবহার করলে সমাজে ফিরে আসবে সচ্ছলতা। এ ছাড়াও তার সেই বিখ্যাত উক্তি ‘একটি উদ্যোগ একটু চেষ্টা এনে দেবে সচ্ছলতা। দেশে আসবে স্বনির্ভরতা। ’ এমন মর্মকথা নিয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। একজন প্রকৃত নেতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখানো। এভাবেই তিনি তরুণদের কাছে টেনেছিলেন। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তার পরিবারকেও সময় দিতে কার্পণ্য করতেন না। এ জন্যই আমরা দেখেছি তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে তার কন্যাকে শিক্ষালয়ে পৌঁছে দেওয়া এবং নিয়ে আসার মতো কাজগুলো করতেন। এত কিছু করার পরও যে মানুষটি প্রতিভাত হতে পারত নন্দিতরূপে। কিন্তু পাকচক্রে নানা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কিছু বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিতে তিনি চিত্রিত হচ্ছেন নিন্দিত রূপে। চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র শব্দ দুটি এখানে কেন ব্যবহার করলাম এর একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আমার পাঠকমাত্রই জানেন, আমি দৃষ্টান্তে বিশ্বাসী। তখন সবে প্র্যাকটিস শুরু করেছি। সচিবালয়ের পাশেই আমাদের ল’চেম্বার। একদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উপসচিব এসে হাজির আমার চেম্বারে। উনার দেশের বাড়িও আমার উপজেলাতেই। তিনি আমাকে একটি বিশেষ দেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে যে, আপনাদের নেতা তারেক রহমান চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের শিকার। উনাকে সাবধান করে দিন। আমি বললাম, উনি যথেষ্ট বিচক্ষণ মানুষ। আদৌ যদি এরকম কিছু হয়, তাহলে উনি সেটা মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখেন। সেই উপসচিব আমাকে তখন বললেন, আপনি কেন বুঝতে চাইছেন না, ষড়যন্ত্র-চক্রান্তগুলো পরিচালিত হচ্ছে উনার কাছের বন্ধু-স্বজনের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রেও উনি কাকে ইঙ্গিত করলেন, আমি সেটা সহজেই বুঝে গেলাম।

আমি মনে করি সুদীর্ঘকাল থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তারেক রহমানকে নিন্দিত রূপে চিহ্নিত করার জন্য সক্রিয়। তা না হলে বর্তমান সরকারের প্রায় ৯ বছর হয়ে গেল। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও তারা এই ৯ বছরে তারেক রহমানের একটি দুর্নীতিও প্রমাণ করতে পারেননি। তাহলে হয়তো এখন অনেকেই বলবেন তার কি এতটুকুও ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল না। এ প্রসঙ্গে আমার শুধু এতটুকুই বলা— আমি এখানে কোনো দেবতার চরিত্র চিত্রায়ণ করতে বসিনি। এই বিশ্ব চরাচরে শুধু ভুল হয় না শয়তানের আর ফেরেশতার। শয়তান হয়তো খুঁজলে এ সমাজে পাওয়া যাবে কিছু। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে আমরা কেউ বলতে পারব না যে আমরা ফেরেশতা। তার আশপাশের লোকজন তো কিছু অন্যায় অত্যাচার করে থাকতেই পারে। তিনি হয়তো সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। রাজা চন্দ্রগুপ্তের গুরু ও প্রধান উপদেষ্টা চানক্য যেমন বলেছিলেন জিহ্বার ডগায় বিষ রেখে যেমন মধুপান সম্ভব নয়— ঠিক তেমনি রাজাকার্যের সঙ্গে যুক্ত থেকে রাজকোষের কিছু না কিছু অর্থ ভোগ থেকে নিজেকে বিরত রাখাও সম্ভব নয়। এ জন্যই হয়তো বঙ্গবন্ধুকে বলতে শুনি— ‘চাটার দল সব খেয়ে নিচ্ছে’। সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। ’ কিংবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন— আমাকে ছাড়া আর সবাইকে কেনা যায়। পরিশেষে শুধু এটাই বলা যায়— বাংলাদেশের কোটি মানুষের প্রত্যাশা, শত প্রতিকূলতা ও অন্ধকার ভেদ করে তারেক রহমান একদিন আবির্ভূত হবেন বাংলাদেশের অন্যতম ত্রাণকর্তা হিসেবে।

লেখক : গল্পকার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

Comments Us On Facebook: