এই অপহরণের উদ্দেশ্য কী?

গত চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৪ ব্যক্তি ‘নিখোঁজ’ হয়েছেন। এরমধ্যে ৮ জন ফিরে এসেছেন। বাকি ৬ জনের এখনও সন্ধান মেলেনি। এসব ব্যক্তিকে অপহরণের পর কোনও মুক্তিপণ চাওয়া হয়নি। অপহরণকারীরা কেবল অপহৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্রের বিষয়ে আগ্রহ দেখায়। অপহৃতদের পরিবারের সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও মানবাধিকারকর্মীদের প্রশ্ন—কোনও মুক্তিপণ না চাইলে কেন অপহরণ? অপহরণকারীরাই বা কারা? তাদের উদ্দেশ্য কী? একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটির মিল দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও মানবাধিকারকর্মী তাদের ধারণা, একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যেএই অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা অপহৃত ব্যক্তিদের জিনিসপত্র সংগ্রহ করছে।

সোমবার (৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় বিমানবন্দর থেকে মেয়েকে আনতে গিয়ে নিখোঁজ হন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। তিনি সর্বশেষ ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন। এর আগে তিনি কাতারের রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন মারুফ জামানের প্রাইভেটকারটি খিলক্ষেতের ৩০০ ফিট সড়ক থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম মারুফ জামান নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাসায় গিয়ে তিন জন সুঠামদেহী ব্যক্তি তার কম্পিউটার ও ল্যাপটপ নিয়ে যায়। এ সময় তারা বাসার ভেতরে তল্লাশিও চালায়। মারুফ জামান নিখোঁজ হওয়ার পরপরই ওই তিন ব্যক্তি তার বাসায় যান। এমনটাই বলা হয়েছে নিখোঁজ সাবেক রাষ্ট্রদূতের পরিবারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

এরআগে গত ৭ নভেম্বর সকালে দক্ষিণ বনশ্রীর বাসা থেকে বের হয়ে কর্মস্থলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মুবাশ্বার হাসান সিজার। এরপর বিকালে আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের একটি মিটিংয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পরপরই নিখোঁজ হন তিনি। একমাসেও তার সন্ধান মেলেনি।

তার নিখোঁজের পরও কোনও মুক্তিপণ বা চাঁদা দাবি করেনি কোনও সংঘবদ্ধ চক্র। তার বাবা মোতাহের হোসেন বুধবার (৬ ডিসেম্বর) বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা কোনও ফোন পাইনি। কোনও মুক্তিপণের জন্য কেউ আসেনি। একমাস হয়ে গেলো, এখনও কোনও খোঁজ পেলাম না। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।’

এই প্রসঙ্গে খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমান বলেন, ‘আমরা তার সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কী কারণে বা কারা তাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে, তা জানার চেষ্টা চলছে। তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

মুবাশ্বার নিখোঁজ হওয়ার একমাস আগে গত ১০ অক্টোবর সাংবাদিক উৎপল দাস রাজধানী থেকে নিখোঁজ হন। তার পরিবারের কাছে কয়েকবার ফোন করে বিকাশে টাকা চাইলেও তা ছিল প্রতারকদের ফোন বলে পুলিশ জানায়। সেই নম্বরের সূত্র ধরেও উৎপলের কোনও খোঁজ মেলেনি। তার ফেসবুক আইডি ও মোবাইল ফোন কখনও কখনও খোলা পাওয়া গেছে। তবে তার হদিস মেলেনি।

এদিকে, গত ২২ আগস্ট বিকালে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ সাদাত আহমেদকে ক্যান্টনমেন্ট থানার বিমানবন্দর সড়ক থেকে অপহরণ করা হয়। তার সঙ্গে থাকা এবিএন গ্রুপের ম্যানেজার নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ৭/৮ জন মাইক্রোবাসে করে সাদাত আহমেদকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।’

অপহৃত সাদাতের স্ত্রী লুনা সাদাত আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অফিসে যাওয়ার সময় তিনি অপহৃত হন। এ সময় তার গাড়িতে একটি ল্যাপটপ ও তার ব্যবহৃত দু’টি মোবাইলফোন ছিল। ঘটনার পর আমাদের কাছে কেউ কোনও চাঁদা বা মুক্তিপণ চায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাদাত অপহৃত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দু’টি অ্যাপস (হোয়াটসআপ, ভাইবার) দুই দিন দীর্ঘ বিরতিতে খোলা ছিল। প্রথম খোলা পাওয়া যায় গত ২৪ আগস্ট, দ্বিতীয় বার খোলা পাওয়া যায় ১১ সেপ্টেম্বর। এই সাড়ে তিন মাসে আর খোলা পাওয়া যায়নি।’

২৫ আগস্ট ধনমন্ডির স্টার কাবারের সামনে থেকে নিখোঁজ হন কানাডার ‘ম্যাকগিল’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ (২০)। তিনি ঢাকায় ছুটিতে এসেছিলেন। এ বিষয়ে নিখোঁজ ছাত্রের বাবা তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী জামালউদ্দিন আহমেদ ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তার পরিবারের কাছেও কোনও মুক্তিপণ বা চাঁদা দাবি করা হয়নি।

কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান। গত ২৭ আগস্ট রবিবার রাত ১০ টার দিকে নয়াপল্টন থেকে সাভারের আমিনবাজার পল্লিবিদ্যুৎ অফিসের পাশে বাসার উদ্দেশে রওনা হন। এরপর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবারের সঙ্গে কেউ যোগাযোগও করেনি। মুক্তিপণ বা চাঁদাও দাবি করেনি কেউ।

অপহরণের পর অপহৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্রের প্রতি অপহরণকারীদের আগ্রহ সন্দেহজনক বলে মনে করছেন মানাবাধিকারকর্মী নূর খান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রদূত অপহৃত হওয়ার পর তার বাসা থেকে কম্পিউটার নেওয়া হলো। কিন্তু সন্ত্রাসীরা শুধু কম্পিউটার নেবে না। তারা টাকা পয়সাও নেবে অথবা দাবি করবে।’ তিনি বলেন, ‘এর আগেও যেসব অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, তাতে তাদের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন নেওয়া হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে কোনও গোষ্ঠী কোনও বিষয়ে তথ্য খুঁজছে। হতে পারে ব্যবসায়িক কোনও কারণে কোনও গোষ্ঠী এসব কাগজ নিয়ে যেতে পারে।’

৩০০ ফিট এলাকায় একাধিক ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে নূর খান বলেন, ‘এই এলাকায় এর আগেও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনা একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িত। এসব বন্ধ হওয়া উচিত।’

গত চার মাসে যে আট জন ফিরে এসেছেন, তারা হলেন, ব্যাংক এশিয়ার এভিপি শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী, দলের কেন্দ্রীয় নেতা আসিত ঘোষ অসিত, বেলারুশের অনারারি কনস্যুলার অনিরুদ্ধ কুমার রায়, দক্ষিণ বনশ্রীর নকিয়া-সিমেন্সের সাবেক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ, এভেনটিস-স্যানোফির ফার্মাসিস্ট জামাল রহমান, শাজাহানপুরের ফল ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন ও গুলশানের প্রকাশক তানভীর ইয়াসিন করিম।

sangbad24

Comments Us On Facebook: